Sylhet Today 24 PRINT

প্রতিবাদ-অনশন-বিক্ষোভের মধ্যে এনসিটি গেল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০৯ অক্টোবর, ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

বন্দর রক্ষা কমিটি, একাধিক রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের তীব্র প্রতিবাদ, অনশন এবং রাজপথের অবস্থান কর্মসূচির মধ্য দিয়েই চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে পেয়েছে দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক টার্মিনাল অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'।

রাজধানীর 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ' অডিটোরিয়ামে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে এই ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম সই করেন।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং ঢাকায় নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি উপস্থিত ছিলেন।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চুক্তি সম্পাদিত হলেও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও কৌশলগত সর্বময় নিয়ন্ত্রণ আগের মতোই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই ন্যস্ত থাকবে। দুবাই সরকারের মালিকানাধীন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড মূলত ১৫ বছরের জন্য টার্মিনালটির পরিচালন, আধুনিকায়ন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে।

চুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড চুক্তি শুরুর পরপরই প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অগ্রিম ফি প্রদান করবে। এর পাশাপাশি প্রথম ১০ বছরে বন্দর প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, নতুন ভারী যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনে তারা ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ করবে। এই কার্যক্রমের বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত বার্ষিক ফি এবং নিয়মিত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট অংশ বা 'রেভিনিউ শেয়ার' অর্জন করবে।

একই সঙ্গে টার্মিনালের সার্বিক নিরাপত্তায় কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না; বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনসহ রাষ্ট্রীয় সকল সংস্থার বিদ্যমান নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোরভাবে বলবৎ থাকবে। নির্দিষ্ট সেবা নিশ্চিত করতে কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই) নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানাসহ কঠোর তদারকির বিধান রাখা হয়েছে।

এই চুক্তির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পটভূমি অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ও জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) কাঠামোর অধীনে চট্টগ্রাম বন্দরের এই লাভজনক টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত আলো দেখেনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হলে প্রক্রিয়াটি পুনরায় গতি পায়। তবে বন্দর শ্রমিকদের লাগাতার বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি কার্যক্রমটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পর গত ৪ জুন দুবাইভিত্তিক কোম্পানিটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা পুনর্ব্যক্ত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠায়।

আলোচনা সুষ্ঠু ও ত্বরান্বিত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যের একটি শক্তিশালী সাপোর্ট টিম গঠন করে এবং কয়েক মাসের ব্যবধানে চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

এদিকে, এই চুক্তির বিরোধিতা করে এদিন দুপুর দুইটা থেকে সিপিবি, বাসদসহ ‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট’-এর বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বেলা পৌনে তিনটার দিকে পুলিশ লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন অভিযোগ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, দুবাইভিত্তিক এই বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের নৌ ও বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়ে মার্কিন প্রভাব বৃদ্ধি পাবে, যা দেশকে পরোক্ষভাবে সার্বভৌমত্ব হারানোর ঝুঁকিতে ফেলবে।

ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামের সামনে সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট এবং গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি যৌথভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, লাভজনক ও সচল এই টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দিলে বন্দর বিশাল অংকের রাজস্ব হারাবে, দেশের শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হয়ে যাবে এবং অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। অধিকন্তু, ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং কনসেশন চুক্তির ফাঁক গলে বিপজ্জনক পণ্য খালাসের শঙ্কা বেড়ে যেতে পারে বলে আন্দোলনকারীরা হুশিয়ারি দেন।

সরকার ও বন্দর প্রশাসনের পক্ষে বৈদেশিক ইজারার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি, বিশ্বমানের লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং কন্টেইনার জট কমানোই এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জোর দিয়ে বলেন যে, সরকারের মূল লক্ষ্য বন্দরের সম্পদসমূহের সক্ষমতা বাড়িয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে স্থিতিশীলতা আনা।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে আশ্বস্ত করেন যে, তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামোর সঙ্গে নিউমুরিংকে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক দূরত্ব ও খরচ বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। বন্দর চেয়ারম্যান এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রধান উভয়েই আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের কার্যক্ষমতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.