সিলেটটুডে ডেস্ক | ১২ অক্টোবর, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপভিত্তিক পাঁচটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ সংগঠনের স্মারকলিপি ও পিটিশনের মুখেই শেষ মুহূর্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন (ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট ২০২৬) থেকে বাদ পড়লেন বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
জার্মানির বার্লিনে গতকাল রোববার (১১ অক্টোবর) থেকে শুরু হওয়া এই বৈশ্বিক সম্মেলনে মূল পর্বে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ে এই সামিটে বিশেষ বক্তা হিসেবে যে আটজনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, সেখানে তিন নম্বরে রাখা হয়েছিল ড. ইউনূসকে। তবে সম্মেলনের চূড়ান্ত বক্তা তালিকায় তার নাম আর দেখা যায়নি।
জানা যায়, তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতি, টিকাদান কর্মসূচির বিপর্যয় এবং জনস্বাস্থ্যের সার্বিক অবহেলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনগুলো ড. ইউনূসের অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিল। সংগঠনগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানিয়েছিল, মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের টিকা ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে। টিকা ব্যবস্থাপনা এনজিওদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তৎকালীন সরকার ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা কেনা বন্ধ করে দেয়, এবং বাংলাদেশে টিকা সংকটে এখন পর্যন্ত হাজারের বেশি শিশুর প্রাণহানি হয়েছে।
যদিও সামিট আয়োজকদের যোগাযোগ ও প্রেসবিষয়ক পরিচালক আনা স্টর্মার এবং সিনিয়র কমিউনিকেশন ম্যানেজার ম্যারি অলফ দাবি করেছেন যে ‘স্বাস্থ্যগত কারণে’ ড. ইউনূস তার কর্মসূচি বাতিল করেছেন, তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত পিটিশন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্দোলনের চাপেই সেশনটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠান 'গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেড' নিয়ে এই সম্মেলনে তার একটি বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা নির্ধারিত ছিল।
পিটিশন ছাড়াও জার্মান আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সম্মেলন স্থলের বাইরে ৪০০ বিক্ষোভকারীর অংশগ্রহণের জন্য পুলিশি অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। বার্লিন পুলিশ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শনিবার বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক মিজানুর হক খানকে ড. ইউনূসের সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
এ বিষয়ে ইউনূস সেন্টারের প্রতিক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা যায়নি।
সূত্র জানায়, তিন সপ্তাহ আগে আয়োজক কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকলিপি জমা দেয় ইউরোপের পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। সংগঠনগুলো হলো- সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম (বেলজিয়াম), ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম (ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য), ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি, আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক, এবং ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স।
সংগঠনগুলোর যৌথ পিটিশনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে চরম বিঘ্ন, টিকার প্রাপ্যতা ও সরবরাহসংকট এবং জরুরি টিকাদান কার্যক্রমের অবহেলা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, তা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূস এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দায় এড়াতে পারেন না।
আয়োজকদের কাছে তাদের তিনটি মূল দাবি ছিল— ড. ইউনূসকে বিশেষ বক্তা করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা; আমন্ত্রণ বহাল থাকলে হাম পরিস্থিতি নিয়ে তাকে প্রকাশ্যে জবাবদিহির মুখোমুখি করা; এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, শিশু চিকিৎসক ও স্বাধীন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা।
এদিকে আয়োজক সূত্রের বরাতে সামিটের প্রেস পরিচালক আনা স্টর্মার নিশ্চিত করেছেন, সম্মেলনে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।
চিকিৎসক হিসেবে পেশাগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জনস্বাস্থ্য সংস্কার, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণে তার ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে সামিট কর্তৃপক্ষ। তিনি ১১ ও ১২ অক্টোবরের বিশেষ অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন।
‘সংকট থেকে স্থিতিস্থাপকতা: স্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভাবন’—এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এবারের সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আগামী ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত আলোচনা চলবে।
উল্লেখ্য, বার্লিনের বিখ্যাত শারিতে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৯ সালে প্রথম ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট’-এর যাত্রা শুরু হয়। ২০০৯ সালের ১৪ থেকে ১৯ অক্টোবর আয়োজিত প্রথম সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিবর্তন’।