সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
খুন হওয়া ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (বাঁয়ে) ও উসকানির দায়ে অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনী (ডানে)। সংগৃহীত ছবি
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ (সরাসরি সম্প্রচার) করে লোকজন জড়ো করা হয়। এরপর দফায় দফায় তাঁকে পেটানো হয়। পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে সেখানেও তাঁকে মারধর করা হয়। এরপর টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের বাইরে নিয়েও পেটানো হয়। শেষে মরদেহের ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া হয়।
ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী তাঁর ফেসবুক (Fh Ameni) প্রোফাইল থেকে লোকজন জড়ো করতে দুই দফা লাইভ করেন। শামমেকে হত্যার পরও তিনি ফেসবুকে সরব রয়েছেন। এই হত্যাকান্ডের সপক্ষে ফেসবুকে বিভিন্ন যুক্তি দিচ্ছেন। সর্বশেষ শুক্রবার সকালেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন আমিনী। তবে পুলিশ তাকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার বেলা ৩টা ৩১ মিনিটে প্রথমবার ফেসবুক লাইভে আসেন অজলুল হক আমিনী। ১৯ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের লাইভে তিনি একটি অডিও শোনান। লাইভে বলা হয়, অডিও কথোপকথনটি শামীমের। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁর উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান ফজলুল হক। লাইভে শামীমের বাড়ির ঠিকানাও দেন তিনি।
একই দিন বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে আবার লাইভে আসেন ফজলুল হক। এই লাইভ তিনি করেন একজন পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে। সেখানে তখন চিকিৎসা নিচ্ছিলেন শামীম। ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের এই লাইভে ফজলুল হক সবাইকে চেম্বারের সামনে আসার আহ্বান জানান। লাইভ করার সময় তাঁর আশপাশে জড়ো হওয়া লোকজনকে উসকে দিচ্ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে সেখানে কয়েক শ মানুষ জড়ো হয়। পরে শামীমকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য পল্লিচিকিৎসককে চাপ দেওয়া হয়।
পরে মারধর করার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাটিতে লুটিয়ে পড়া শামীমকে ঘিরে আছে বহু মানুষ। কয়েকজন তাঁর বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করছিলেন। আরেকটি ভিডিওতে শামীমের শাস্তির দাবিতে দেবহাটা উপজেলা সদরে মিছিল করতে দেখা যায়। মিছিলের সামনে ফজলুল হককে দেখা গেছে।
নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। গত মঙ্গলবার দফায় দফায় তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, ফজলুল হকের নেতৃত্বে একদল লোক তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।
মৃত্যুর পর ফেসবুকে পোস্ট
গত মঙ্গলবার রাত ১১টা ১১ মিনিটে ও রাত ১২টা ৮ মিনিটে ফেসবুকে দুটি পোস্ট করেন ফজলুল হক। প্রথম পোস্টে শামীমকে ‘কই মাছের জান’ এবং দ্বিতীয় পোস্টে হত্যা করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান বলেন, তাঁর ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। কখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন, আবার কখনো অসংলগ্ন আচরণ করতেন। এলাকার মানুষও ভাইয়ের অসুস্থতার বিষয়টি জানতেন। মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুল হকের নেতৃত্বে জামায়াতের সমর্থক হিসেবে পরিচিত একদল লোক তাঁর ভাইকে মারধর করেন। পরে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানেও দলবল নিয়ে হামলা চালিয়ে ভাইকে পিটিয়ে মেরে ফেলে।
তাওসিফ বলেন, তাঁর ভাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। পাশাপাশি কামিল পাস করেছেন, হোমিওপ্যাথি নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে আছে।
সবশেষ শুক্রবার সকালে তিনি ফেসবুকে লিখেন- ‘আমি আপনাদের মাঝে থাকবো না, যে কোন সময় আমাকে এরেস্ট করা হবে, কিন্তু মোনাজাতে আমাকে শামিল রাখবেন, তামাম বিশ্ববাসী আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলেও কিছু যায় আসে না যদি আল্লাহ পাক আমাকে মাফ করে দেন, এযুগের গাজী ইলমুদ্দিন হিসেবে আমাকে এবং এই অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল সকলকে যেন কবুল করে নেন, হে আল্লাহ আমার পরিবারকে আপনার কুদরতি হাতে সোফোরদো করলাম তাদের উপর রহম করুন সবর করার তৌফিক নসিব করুন, বিশ্বাস করে আমার বড় পুত্র মাওলানা মুফতি শেখ সাদী ডেঙ্গু পজেটিভ আক্রান্ত তাকে আপনি পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করুন এবং আমাকে ঈমানের উপরে অবিচল রাখবেন আমরণ, আল্লাহুম্মা আমীন।’
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিলের ভাষ্য, গত সোমবার শামীম ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের মধ্যে ঝগড়ার সময় কথাগুলো অন্য কেউ রেকর্ড করেছিলেন। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্য আছে—এমন অভিযোগ উঠলে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর তাঁদের বাড়িতে হামলা করে দরজা ও দেয়াল ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর শামীমকে প্রথমে বাড়ির পাশের সুবর্ণাবাদ বাজারে মারধর করা হয়। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে ফজলুল হকের নেতৃত্বে লোকজন ওই চেম্বার থেকে তাঁকে বের করে আবার মারধর করেন। খবর পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে পুলিশ। সেখানেও তাঁকে মারধর করা হয়।
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, শতাধিক লোক হাসপাতালে ঢুকে শামীমকে মারধর করে। পরে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করা হয়। পরে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীমের মৃত্যু হয়।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযুক্ত ফজলুল হক বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর করা অপরাধ। তবে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে শরিয়তের বিধান ভিন্ন। অতীতে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পদক্ষেপে তিনি সন্তুষ্ট নন।
এক প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। কিন্তু ধর্ম, কোরআন ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কেউ বিরূপ মন্তব্য করলে প্রতিবাদ করার জন্য তিনি নিজ থেকে এগিয়ে যান। এ ধরনের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকার প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে জানান।
ফজলুল হক জানান, তিনি একসময় মসজিদের ইমাম ছিলেন। এখন গ্রামের বাজারে পশু জবাই করতে তাঁকে ডাকা হয়। এ ছাড়া মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনের কাজ করেন।
লোক জড়ো করে শামীমকে পিটিয়ে হত্যা করার বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক বলেন, কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, ‘এ ঘটনাকে জামায়াত-শিবিরের দলীয় কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না। আমি শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানাই এবং জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।’
মামলা করেছে পরিবার
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীনের বলেন, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ফজলুল হক আমিনীর উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য পর্যালোচনা করছে পুলিশ। তাঁর আচরণের ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। তাঁকে আটক করতে অভিযান চলছে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো পুলিশ সংরক্ষণ করেছে বলে জানান ওসি। তিনি বলেন, ভিডিও পর্যালোচনা ও প্রযুক্তির সহায়তায় হামলা ও মারধরে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় ফজলুল হকসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত পরিচয় আসামি করা হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে। মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
সূত্র: প্রথম আলো