সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
গাড়ি থেকে নেমেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন চিৎকার করে বললেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ তার পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা গেল, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা তখন কয়েকজনকে ধরতে দৌড়াচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজনকে লাথিও দেন এক দেহরক্ষী।
রাজধানীর কয়েকটি মাদক আস্তানায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে এমনই ‘অ্যাকশনে’ দেখা গেছে।
আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের এই ভিডিও নিজেই সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। এরপর সেটা তিনি সরিয়েও ফেলেছেন।
গাড়ি থেকে নেমেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন চিৎকার করে বললেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ তার পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা গেল, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা তখন কয়েকজনকে ধরতে দৌড়াচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজনকে লাথিও দেন এক দেহরক্ষী।
রাজধানীর কয়েকটি মাদক আস্তানায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে এমনই ‘অ্যাকশনে’ দেখা গেছে।
এ সংক্রান্ত দুটি ভিডিও নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছেন তিনি। ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর হাতে পিস্তল দেখা গেছে। তবে, পিস্তলের কিছু অংশ ভিডিওতে ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন–সংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। এ অভিযানে নেতৃত্ব দেনঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
প্রকাশিত ভিডিওতে বলা হয়, গেন্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় মাদক আস্তানা গুড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। অপর একটি ভিডিওতে বেশ কয়েকজনকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে পুলিশকে নিয়ে যেতে দেখা গেছে।
ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা পিস্তলটির কিছু অংশ ব্লার করা থাকলেও সেটি কী ধরনের অস্ত্র, তা ভিডিও থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযানের সময় তার হাতে অস্ত্রটি থাকার কারণ এবং সেটি ব্যবহারের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওতে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের সঙ্গে থাকা আরও দুই ব্যক্তির হাতে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে তারা সেখানে যান। স্থানীয় লোকজনের বারবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশকেও জানানো হয়েছিল। তবে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করে।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের ফেসবুকে প্রকাশ করা ভিডিওটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’। সেখানে ঘটনার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬; স্থান গেন্ডারিয়া রেললাইন–সংলগ্ন এলাকা।
ভিডিওতে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক অস্ত্র হাতে গাড়ি থেকে নামার পর তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা রেললাইনের পাশে অবস্থান করা কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। এ সময় কয়েকজন যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’
প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তার নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলু ছিলেন। পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষী ছিলেন। নিজের নিয়োগ দেওয়া দেহরক্ষীদের কাছেও অস্ত্র ছিল। সরকারি দেহরক্ষীকে অস্ত্র তাক করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে একজন দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি দেন। লাথি দেওয়া ব্যক্তি কে, জানতে চাইলে ছাত্রদল নেতা পাভেল শিকদার বলেন, তিনি প্রতিমন্ত্রীর সরকারি দেহরক্ষী। তবে তার নাম জানাতে পারেননি পাভেল।
ভিডিওতে গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সেখানে গুলি ছোড়া হয়নি বলে দাবি করেছেন পাভেল শিকদার।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। তার মধ্যে রয়েছে—
এক. প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ কি না?
দুই. বৈধ হলেও একজন প্রতিমন্ত্রী কি এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না?
তিন. মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের যদি এভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজ কী?
চার. সিস্টেম বা ব্যবস্থা ঠিক না করে এভাবে একজন প্রতিমন্ত্রীর অভিযান গ্রহণযোগ্য কি না?
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক গণমাধ্যমের কাছে দাবি করে বলছেন, তার হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ। যদিও গত সংসদ নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া তার হলফনামায় আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক বলেন, তিনি অস্ত্রটি নিয়েছেন ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার পর। যখন তিনি এটি নিয়েছেন, তখন মনোনয়নপত্রে দেখানোর সুযোগ ছিল না। মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ছিল ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২৮ ডিসেম্বর।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদের ‘ক’ উপ–অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি স্বীয় লাইসেন্সে অন্তর্ভুক্ত অস্ত্র আত্মরক্ষার নিমিত্ত নিজে বহন/ব্যবহার করতে পারবেন। তবে অন্যের ভীতি/বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে, এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।’
বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। তার সংসদীয় আসনের মধ্যে গেন্ডারিয়ার রেলস্টেশন–সংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকাটি পড়েছে। সেখানে মাদক ব্যবসা হয়। এলাকার মানুষ বারবার তার কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে কাজ হয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়ে তিনি সেখানে গেছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুলিশ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তিনি অন্ততপক্ষে ৩০-৪০ বার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা একেক সময় একেক কথা বলে। তাদের জনবল কম, গাড়ি নেই—এসব কথা বলে। এর আগে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মাদক ব্যবসায়ীরা দূর থেকে গুলি করে দেয়। সে কারণে তার হাতে অস্ত্র ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি তো আর গুলি করি নাই, ওটা নিয়ে কাউকে ভয়ও দেখাই নাই। হ্যাঁ, অভিযান আমরা করেছি, আমরা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছি।’
অবশ্য ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র তাক করে আছেন। ঘটনাস্থলে শিশুরাও রয়েছে।
এদিকে, শুরুতে প্রতিমন্ত্রী এই অভিযানের ভিডিও প্রকাশ করলেও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হলে শনিবারের মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিওটি তার পেজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, সরকার ও মন্ত্রীদের কাজ হলো নির্দেশ দেওয়া। পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। মন্ত্রীকেই যদি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজ কী? শরীফ ভূঁইয়া বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রী যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন, তা বেআইনি।