Sylhet Today 24 PRINT

জামায়াত নেতাদের নেতৃত্বেই সাঈদীর মামলার বাদী মানিক পশারীর দাফনে বাধা

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার প্রদান ও মরদেহ দাফনে বাধা প্রদান করা হয়েছে। পরে গোপনীয়ভাবে পরিবারের সদস্যরা মানিক পশারীকে দাফন করেন।

স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরাই মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেয় বলে জানা গেছে। যদিও জামায়াত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থাকায় তারা গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল।

অন্যদিকে বিএনপির অভিযোগ, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির দায় জামায়াত এড়াতে পারে না।

৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় শনিবার সকাল ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

শনিবার দুপুরে অ্যাম্বুলেন্সে তার মরদেহ পিরোজপুরে পৌঁছালে দাফন ও গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শহরের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের জড়ো হতে দেখা যায়। দফায় দফায় মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পুলিশি পাহারায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে সাংবাদিকসহ অন্যদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

বিকেলে পুলিশ লাইনের ভেতরে গোপনীয়তার সঙ্গে মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রোববার রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে তার মরদেহ দাফন করা হয়।

গার্ড অব অনার এবং দাফনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি জামায়াত নেতারা অস্বীকার করলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি ভিন্ন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদে গার্ড অব অনার দেওয়ার সময় বাধা দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন নেতাকর্মী।

এছাড়া রাতে পৌর কবরস্থানে কবর খোঁড়ার কাজেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে। একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, জামায়াত নেতা জহিরুল হক ইউনুস ও সাবেক শিবিরের জেলা সভাপতি মাহাবুবুল আলম নাঈম এ বাধা প্রদান করেন। এ ছাড়া পাড়েরহাট বাজারে শিবির নেতা মঈনের নেতৃত্বে পিরোজপুরের মাটিতে মানিক পশারীকে দাফন না করার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়।

এ বিষয়ে মানিক পশারীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বাধাপ্রদানকারীদের সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে দাফনের পরপরই তারা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তাদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

যদিও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জহিরুল হক। তার দাবি, তারা মরদেহ দাফনে বাধা দেননি। মানিক পশারী প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকায় তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তারা। সেই আপত্তিকে কেন্দ্র করে দাফনে বাধা দেওয়ার অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে এর আগে ঘটনার দিন দুপুরে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক গণমাধ্যমকে বলেন, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মিথ্যা মামলার বাদী মানিক পশারি। সেই কুখ্যাত ব্যক্তি মারা গেছেন। আমরা জানি তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, উনি একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তার নাম এখন পর্যন্ত গেজেটে আছে। এটা দুঃখজনক।

তিনি আরও বলেন, এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেতে পারেন না। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তো অবশ্যই, তারপর আবার বিশ্ববরেণ্য আলেম আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন, তাকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি তার শাহাদাত বরণের পেছনে মানিক পশারীর দায় রয়েছে।

এসময় আব্দুর রাজ্জাক এও বলেন, মানিক পশারী রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেতে পারেন না এবং তার দাফনে পিরোজপুরের সাধারণ মানুষ আগ্রহ নেই।

লাশ দাফনে বাধা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেণ পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদীও। রোববার ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লিখেন- লাশ দাফনে বা জানাজায় কোনো বাঁধা ছিলনা, জনগনের আপত্তি ছিল ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাকে 'গার্ড অব অনার' প্রদানে— যা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা।

পুরো ঘটনার জন্য জামায়াতের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছেন পিরোজপুর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের আহ্বায়ক গাজী কামরুজ্জামান শুভ্র। তিনি বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ দাফন ও গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির দায় জামায়াতের নেতাকর্মীরা এড়াতে পারেন না।

মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে শুভ্র বলেন, মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে তার নাম রয়েছে। একজন মুসলমানের মৃত্যুর পর তার দাফন-কাফনে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনার তীব্র নিন্দাও জানান তিনি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.