ডেস্ক রিপোর্ট | ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫
অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি। রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। যুদ্ধাপরাধিদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও কার্যকরের দাবি এবং নাশকতার বিরুদ্ধে মানবিক দ্রোহের শপথে পালিত হোক এ দিনটি।
এবারের মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে সে পরিস্থিতিতে যখন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ক্রমান্বয়ে কমছে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে ভয়াবহ নাশকতা, পেট্রোলবোমায় আক্রান্ত হয়ে মানুষ ক্রমে ধাবিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে, বেঁচে আছে যারা তারাও আছে চরম এক অসহনীয় পরিস্থিতিতে। কেউ জানে না কখন কীভাবে দুয়ারে কড়া নাড়ে মৃত্যুদূত।
রাজাকারদের বিচারকার্য চলছে কিন্তু রায় কার্যকরের গতি মন্থর, উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে অনেকগুলো আপীল নিষ্পত্তি। তাই এই দিনটি দেশের মানুষের কাছে চেতনা উজ্জ্বীবক এক দিন হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে এবং দেশের মানুষের প্রত্যাশা অচিরেই সব যুদ্ধাপরাধিদের সাজা কার্যকর হবে এবং নাশকতার বিরুদ্ধে মানবিক দ্রোহের মাধ্যমে এ দেশ থেকে বিতাড়িত হবে সমূহ অপশক্তি।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি পূরণের ৬৩ বছর পূর্ণ হচ্ছে এই দিনে। বাঙালি জাতির চির প্রেরণা ও অবিস্মরণীয় এই দিনটি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হবে। জাতির জীবনে শোকাবহ, গৌরবোজ্জ্বল, অহঙ্কারে মহিমান্বিত চিরভাস্বর দিন।
বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির আত্ম-অন্বেষার পটভূমি বিনির্মাণের গৌরবোজ্জ্বল দিন ২১ ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের এই দিনে 'বাংলা'কে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ও যুব সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতিতে পাকিস্তানি শাসকদের শঙ্কিত করে তোলায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি সেদিন 'মায়ের ভাষা'র মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পায় নবপ্রেরণা। এরই পথ বেয়ে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পরবর্তী ৯ মাস পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে সংযোজিত হয় নতুন এক স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ- 'বাংলাদেশ'।
একুশের প্রথম প্রহর থেকেই জাতি কৃতজ্ঞ চিত্তে ভাষা শহীদদের স্মরণ করছে। হূদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিয়ে সকলের কণ্ঠে বাজছে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী রচিত একুশের অমর শোকসঙ্গীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি...।’ এই শোকসঙ্গীতটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। আজ সারাদেশের সবকটি শহীদ মিনার ফুলে ফুলে ভরে ওঠবে।
মাতৃভাষার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে বাঙালি জাতি যে ইতিহাস রচনা করেছিল, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্ব তাকে বরণ করেছে সুগভীর শ্রদ্ধায়। ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।
যখন স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ এগিয়ে চলেছে, ধর্মান্ধ মৌলবাদী মানবতাবিরোধী অপশক্তি যখন দেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডল অস্থির-অশান্ত করে তোলার চক্রান্তে লিপ্ত তখন চির প্রেরণার প্রতীক অমর একুশে নতুন তাত্পর্য নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয়েছে। তাই আজ শুধু শোক নয়, শোককে শক্তিতে পরিণত করার দিন।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ হয়ে অন্যের ভাষা ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে নিহিত আছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল চেতনা। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে মহান ভাষা আন্দোলনে শহীদদের অম্লান স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। রাষ্ট্রপতি ভাষা শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে সকল ভেদাভেদ ভুলে একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার শপথ নেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অমর একুশে আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক। আসুন পবিত্র সংবিধান ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখি। সন্ত্রাস ও হানাহানির পথ পরিহার করে দেশ ও জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার শপথ নিই।