সিলেটটুডে ডেস্ক | ২০ এপ্রিল, ২০১৬
মসজিদের নিয়ন্ত্রণ ও টাকার ভাগের লোভে খাদেম হাবিবের প্ররোচনা ও পরিকল্পনায় পুরান ঢাকার ইসলামপুরের ঝব্বু খানম মসজিদের মুয়াজ্জিন বিল্লাল হোসেন খুন হন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মুয়াজ্জিনের সহকর্মীরাই ‘অর্থের ভাগ ও ক্ষমতার লোভে’ হত্যা করেছে বলে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে সংবাদ সম্মেলনে জানায় পুলিশ।
মঙ্গলবার ভোররাতে মূল পরিকল্পনাকারীসহ চারজনকে আটক করে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানায় মহানগর পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মসজিদের জুনিয়ার মুয়াজ্জিন মোশারফ হোসেন (২৩), খাদেম মো. হাবিবুর রহমান (২০), বিল্লালের বন্ধু হাফেজ সরোয়ার হালিম (২২) ও হাফেজ তোফাজ্জল হোসেন (২৩)।
বিল্লালকে খুন করতে এর আগেও দুই দফা চেষ্টা হয়, তবে দুইবারই বেঁচে গিয়েছিলেন ৫৭ বছর বয়সী এই মুয়াজ্জিন। গত ২৮ বছর ধরে বিল্লাল পুরান ঢাকার ইসলামপুরের ওই মসজিদে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গত ৪ এপ্রিল মসজিদের সিঁড়িতে তার রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক পারভেজ হোসেন জানান, সরোয়ারকে হত্যাকাণ্ডের পরপরই ৫৪ ধারায় আটক করেছিল পুলিশ। মোশারফ হোসেনকে সোমবার রাতে নেত্রকোণায় তার গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর তার দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে তোফাজ্জাল এবং মঙ্গলবার রাতে নড়াইল থেকে হাবিবকে গ্রেপ্তার করা হয়।
“মসজিদের নিয়ন্ত্রণ ও টাকার ভাগের লোভে খাদেম হাবিবের প্ররোচনা ও পরিকল্পনায় বিল্লালকে হত্যা করা হয় বলে গ্রেপ্তার বাকিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমাদের জানিয়েছে,” বলেন তদন্ত কর্মকর্তা।
মুয়াজ্জিন বিল্লাল মসজিদের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে থাকতেন। ৪ এপ্রিল ভোরে ফজরের সময় ইমাম নামাজ পড়াতে এসে সিঁড়িতে বিল্লালের লাশ দেখে থানায় খবর দেন।
কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. মওদুদ আহমেদ সেদিন জানিয়েছিলেন, বিল্লালের বুকে তিনটি এবং পিঠ ও হাতে একটি করে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পেয়েছেন তারা। যে ঘরে বিল্লাত থাকতেন, সেটি তালা দেওয়া অবস্থায় ছিল।
গ্রেপ্তার মোশারফ জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, খুনের সময় তিনি তৃতীয় তলায় নিজের কক্ষে ছিলেন। বিল্লালের চিৎকার শুনতে পেলেও ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তবে তার কাছ থেকেই হত্যা পরিকল্পনার বিষয়ে বিশদ তথ্য পাওয়া যায় বলে তদন্ত কর্মকর্তা জানান।
মোশারফ পুলিশকে বলেছেন, ছয় মাস আগে ছয় হাজার টাকা মাসিক বেতনে তিনি ওই মসজিদে চাকরি নেন। আর খাদেম হাবিব ওই মসজিদে কাজ করছিলেন তিন বছর ধরে, তার বেতন মাসে সাড়ে ৫ হাজার টাকা।
হাবিব খাদেমের কাজ করলেও তাকে, বিল্লাল ও মোশারফকে এলাকার মানুষ মুয়াজ্জিন হিসেবে চিনতো। পড়ালেখা শেষ না করায় হাবিবের পক্ষে কখনও প্রধান মুয়াজ্জিন হওয়া সম্ভব ছিল না। এ কারণে তার মধ্যে হতাশা ছিল বলে মোশারফ পুলিশকে জানিয়েছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “বিল্লালকে হত্যা করতে পারলে মোশারফকে মুয়াজ্জিন বানানো হবে, আর মসজিদের আয়ের টাকা তারা ভাগ করে নেবেন। এমন লোভ দেখানোর পরই মোশারফ ওই পরিকল্পনায় রাজি হন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “মোশারফ ও হাবিবের সঙ্গে বিল্লালের ধর্মীয় মতাদর্শেরও বিরোধ ছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। তবে অর্থ ও ক্ষমতার লোভই এ হত্যার পেছনের মূল কারণ।”
মহানগর পুলিশের লালবাগ জোনের উপ কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ বুধবার দুপুরে ঢাকায় পুলিশের গণমাধ্যম কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে চারজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ঝব্বু মসজিদের নিচের দুটি ফ্লোরে ৩৩টি দোকান থেকে প্রতিমাসে ৪২ হাজার টাকা ভাড়া আসে। এছাড়া মসজিদের দানবাক্স থেকেও আয় হয়। বিল্লাল বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েও বাড়তি রোজগার করতেন।
“মসজিদের কর্মীদের বেতন দেওয়ার পর অতিরিক্ত টাকা বিল্লাল নিজের অ্যাকাউন্টে জমা রাখতেন এবং বাইরের লোকের কাছে লাভে খাটাতেন। খাদেম হাবিব ও দ্বিতীয় মুয়াজ্জিন মোশাররফ মসজিদে বিল্লালের এই একক আধিপত্য মেনে নিতে পারছিলেন না। এ কারণেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।”
পুরান ঢাকার ২৪ নম্বর ইসলামপুর রোডের চারতলা একটি ভবনের ওপরের তিনতলাজুড়ে ঝব্বু খানম মসজিদ, নিচতলায় মার্কেট। মসজিদের তৃতীয় তলার একপাশে তিনটি কক্ষ। এর পশ্চিম পাশের কক্ষটিতে থাকতেন বিল্লাল।
বিল্লালের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিদ্দিকনগরের দাসুরাপাড়ায়। তবে ছোটবেলা থেকেই তিনি ঢাকায় থাকেন। পড়ালেখা করেছেন তাঁতীবাজারের একটি কওমি মাদ্রাসায়। তার এক ছেলে ঢাকায় একটি মাদরাসায় পড়েন। আর মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী থাকেন মানিকগঞ্জে।