সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৪ এপ্রিল, ২০১৬
রানা প্লাজা ধসের তিন বছর পূর্ণ হল আজ (২৪ এপ্রিল)। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৬ জনে, আহত হয় আরো ১ হাজার ৫শ ২৪ জন। এ ঘটনায় দায়ের করা হয় পৃথক দুই মামলা। কিন্তু তিন বছরেও তার বিচার শুরু হয়নি। পলাতক রয়েছে এ মামলার ১২ আসামি।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সেই দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১১৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরবর্তী সময়ে আরও ১৯ জন মারা যায়। এ বিপর্যয়ে করা হত্যা মামলায় ২০১৫ সালের ১ জুন ভবনটির মালিক সোহেল রানা, রানার বাবা-মাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর। প্রায় বছরখানেক ধরে মামলাটির পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের পর সম্প্রতি মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে। গত ১৫ মার্চ ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নথি সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর আদেশ দেন। জেলা ও দায়রা জজ আদালতে নথি আসার পর ওই আদালত আগামী ২৮ এপ্রিল আসামিদের উপস্থিতি এবং মামলাটি বিচারের আমলে গ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেছেন।
মামলাটিতে এখনো ১২ আসামি পলাতক রয়েছেন।
তারা হলেন, সাভার পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাভার পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলাম, উপ-প্রধান পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, নান্টু কন্ট্রাক্টর, ইথার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস, মো. শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, মনোয়ার হোসেন বিপ্লব, সৈয়দ শফিকুল ইসলাম জনি, রেজাউল ইসলাম, আব্দুল মজিদ, নয়ন মিয়া ও মো. ইউসুফ আলী।
তিন বছর পার হলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র না পাওয়ায় এ ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়নি। এ মামলায় কারাগারে রয়েছে ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৬ জন। এখনও অধরা হত্যা মামলার ১২ আসামি। ৪১ আসামির ২৩ জনই আছে জামিনে।
২০১৩ সালের এই দিনে কি ঘটেছিল তা শুধু বাংলাদেশই নয়, সারা বিশ্ববাসী জেনেছিল। ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা। সাভারের নয়তলা ভবন রানা প্লাজার পাঁচটি কারখানার শ্রমিকরা দল বেধে প্রবেশ করছেন। যে যার মতো করে কাজে যোগ দিচ্ছেন। তখনও তারা জানতেন না কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। সকাল সাড়ে ৮টায় একযোগে চালু করা হয় ডজনখানেক জেনারেটর। কেঁপে ওঠে নয়তলা ভবনটি। এর কিছুক্ষণের মধ্যে বিশাল এ ভবনটি ধসে পড়ে। হাজারখানেক শ্রমিক প্রাণ হারায় ঘটনাস্থলেই। ভবনে আটকে পড়া ও হাসপাতালে মারা যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৬ জনে। ঘটনায় আহত হন আরও কয়েক হাজার। দেশের ইতিহাসে একসঙ্গে এত শ্রমিক মারা যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। এর আগে ২৩ এপ্রিল বিকেলেই ওই ভবনটিতে ফাটল দেখা দিয়েছিল। প্রাণের ভয়ে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে চায়নি ২৪ এপ্রিল সকালে। কিন্তু ভবন মালিক সোহেল রানা জোর করে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেন। ফাটলের কারণে ভবনে ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও খোলা ছিল পোশাক কারখানা। ভয়াবহ ভবন ধসের ঘটনায় প্রাণে দাগ কেটে যায় গোটা বিশ্ববাসীর। উন্মোচিত হয়ে যায়, কতটা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে এদেশের পোশাক শ্রমিকরা। লাভের পেছনে ছুটতে গিয়ে পোশাক শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের কীভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় এ বিষয়টিও উঠে আসে গণমাধ্যমগুলোতে। এ ঘটনায় চরম অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প।
স্মরণকালের ভয়াবহ ভবন ধসের ঘটনার তিন বছর চলে গেলেও অনেকেই পাননি নিহত স্বজনদের লাশ। এখন পর্যন্ত প্রকৃত নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে হাইকোর্টে শ্রম মন্ত্রণালয়ের দেয়া তালিকায় নিখোঁজের সংখ্যা বলা হয়েছে, ৩৭৯ জন। উদ্ধারকারীদের নেতৃত্ব দেয়া সেনাবাহিনীর নিখোঁজ তালিকায় বলা হয়েছে ২৬১ জন। এর মধ্যে প্রথম দফায় ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পাওয়া যায় ১৫৭ জনের খোঁজ। দ্বিতীয় দফায় পরিচয় মেলে ৪২ জনের। শ্রম মন্ত্রণালয়ের তালিকা ধরে এখনও নিখোঁজ ১৬২ জন শ্রমিক। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিখোঁজের তালিকা তৈরিতে সরকার, সেনাবাহিনী, শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে কমিটি তৈরি করা হয়। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নমুনা নিয়ে মরদেহের নমুনার সঙ্গে মেলানো হয়। ত্রাণ ও পুনর্বাসন দফতর বলছে, এ পর্যন্ত ১৭৭ জনের ডিএনএ মিলে যাওযায় তাদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর জুরাইন কবরস্থান ১১৪ জনের কবর রয়েছে। যাদের খোঁজ কেউ কোনদিন করেনি। তাদেরও কোন পরিচয় এই তিন বছরেও পাওয়া যায়নি। ওই ঘটনায় যারা আহত হয়েছিলেন তাদের অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। আহত শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভাল হলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জটিলতা রয়েছে।
রানা প্লাজায় দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শ্রম মন্ত্রণালয়, রাজউক, শিল্প, স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজিএমইএ’র একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে দুর্ঘটনার জন্য নয়টি কারণকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিজিএমইএ। ভবন তৈরিতে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে নয়তলা ভবন নির্মাণ, কলকারখানা পরিদর্শন বিভাগের অসচেতনতা, সাভার পৌরসভার সংশ্লিষ্ট বিভাগের অবহেলা ইত্যাদি কারণে ভবনটি ধসে পড়ে। তাছাড়া একসঙ্গে সব জেনারেটর চালু করা এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি জনবল থাকাকে দুর্ঘটনার বড় কারণ বলে চিহ্নিত করেছে বিজিএমইএ’র তদন্ত কমিটি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে রানা প্লাজা ভবন ধসের জন্য নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, ইমারত নির্মাণ আইন অনুসরণ না করে ভবন নির্মাণ, মার্কেটের ওপরে অনুমোদিতভাবে ভবনের উচ্চতা বাড়িয়ে গার্মেন্টস স্থাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ঝুঁকুনি সৃষ্টির মতো যন্ত্রপাতি ও জেনারেটরসহ সরঞ্জামাদিসহ অতিরিক্ত পোশাককর্মী প্রবেশে বাধ্য করা এ পাঁচটি কারণকে দায়ী করা হয়। প্রতিবেদনে ভবন মালিক সোহেল রানা এবং ওই ভবনের পাঁচ পোশাক কারখানা মালিকের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৩০৪ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ যাবজ্জীবন বা ১০ বছরের কারাদ-, অর্থদ- অথবা উভয় দ-ের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে ভবন ধসের জন্য ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে’ দায়ী স্থানীয় মেয়র, কাউন্সিলর, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীসহ অন্যদের বিরুদ্ধেও একই সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।
এ ছাড়া রানা প্লাজা ধসের জন্য ২৪ জনকে সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। রাজউকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবনটি নির্মাণে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। ছয়তলা ভবনের নক্সা নিয়ে নয়তলা করা হয়।
ঘটনার দিনই ভবন ধসে প্রাণহানির ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে সাভার মডেল থানার এসআই ওয়ালী আশরাফ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে অপরাধজনক প্রাণনাশেরও অভিযোগ আনা হয়। ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ওই মামলায় ২১ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া রাজউকের পক্ষ থেকেও ১৯৫২ সালের ইমারত নির্মাণ আইনের ১২ ধারায় সাভার মডেল থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন রাজউকের দায়িতপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল আহমেদ। এ মামলায় রানাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর গত বছরের ১ জুন দ-বিধি আইনের মামলায় ৪১ জন এবং ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দেয় সিআইডি। ইমারত নির্মাণ আইনের ১৮ জন আসামির মধ্যে ১৭ জনেই দ-বিধির চার্জশীটে রয়েছেন। দুই চার্জশীট মিলে মোট আসামি ৪২ জন। এদের মধ্যে মাহবুবুল আলম নামক একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী শুধু ইমারত নির্মাণ আইন মামলার আসামি।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইমারত নির্মাণ আইনে দায়ের হওয়া মামলার অভিযোগপত্রে যে ১৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৫ জন এখনও পলাতক রয়েছেন। বাকিদের মধ্যে মাত্র দুইজন কারাগারে, ১১ জন জামিনে রয়েছেন। আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচিত এই ঘটনার দুই বছরেরও বেশি সময় তদন্তের পর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি। অভিযোগপত্র দেয়ার পরও প্রায় ১১ মাস পেরিয়ে গেছে। আদালত থেকে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আইনশৃক্সখলা বাহিনী পলাতক আসামিদের গ্রেফতার সম্পর্কিত কোন হালনাগাদ তথ্য দিতে পারেনি। সূত্র জানায়, আদালতে অভিযোগপত্র দেয়ার পর রানা প্লাজা ধসের ঘটনার আসামিদের গ্রেফতারে কোন প্রচেষ্টা নেই আইনশৃক্সখলা বাহিনীর। পলাতকদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের বাইরেও চলে গেছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। সাভার পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলামসহ বর্তমানে ১২ আসামি পলাতক রয়েছেন।
পলাতক আসামিরা হলেন,সাভার পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহাবুবুর রহমান, উপ-প্রধান পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, ঠিকাদার নান্টু, ইতার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস এবং আবদুল মজিদ, শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, মনোয়ার হোসেন, সৈয়দ শফিকুল ইসলাম, রেজাউল ইসলাম, আবদুল হামিদ ও নয়ন মিয়া। দুই মামলায় বর্তমানে ২৩ আসামি জামিনে রয়েছেন।
জামিনে থাকা আসামিরা হলেন, ভবন মালিক সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক ওরফে কুলু খালেক, সাভার পৌর মেয়র রেফাত উল্লাহ, কাউন্সিলর মোহাম্মাদ আলী খান, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, রাকিবুল হাসান রাসেল, নিউওয়েব বাটনের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইতার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিস, আমিনুল ইসলাম, সাইট ইঞ্জিনিয়ার সারোয়ার কামাল, আবু বক্কর সিদ্দিক, মধু, অনিল দাস, শাহ আলম ওরফে মিঠু, আবুল হাসান, সাভার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, সোহেল রানার মা মর্জিনা বেগম, শ্রম মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠা পরিদর্শন দফতরের পরিদর্শক (প্রকৌশল) ইউসুফ আলী, উপ-প্রধান পরিদর্শক শহীদুল ইসলাম, ইউসুফ আলী, তসলিম, নয়ন মিয়া, মাহবুবুল। এ ছাড়া কারাগারে রয়েছেন ভবন মালিক সোহেল রানা, তার সহযোগী আতাউর রহমান, আবদুস সালাম, বিদ্যুৎ মিয়া, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ইমারত পরিদর্শক আওলাদ হোসেন, ঢাকা বিভাগীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান দফতরের যুগ্ম শ্রম পরিচালক জামসেদুর রহমানসহ ৬ জন। রানা প্লাজা ধসের দুই মামলার একটিতে ৫৯৪ জনকে এবং অপর মামলায় ১৩০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এসব সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ জেরা শেষ করতে কিছু সময় লাগবে। খুব শীঘ্রর এ মামলার বিচারকার্য শেষ হবে না। মামলার সরকারী কৌঁসুলি আনোয়ারুল কবির বলেন, মামলার বিচারকার্য শুরু হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। দ্রুত বিচারকার্য শুরু হলে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তিও হবে বলে আশাপ্রকাশ করেন তিনি।
রানা প্লাজা ধসের পর সেই ভবনের যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের মধ্যে শতকরা ৫৮ দশমিক ৪ ভাগ আহত শ্রমিক এখনও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আহতদের শতকরা ৩০ জন কোনমতে সংসার চালাচ্ছেন। মৃত শ্রমিকদের মধ্যে ৩ দশমিক ৮ ভাগ পরিবারের মাসিক কোন আয় নেই। আহত শ্রমিকরা যে আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন তার ৩৩ ভাগই ধার-দেনা শোধ করতে খরচ হয়েছে। আর ৪৯ ভাগ খাবার, ওষুধ ও সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ব্যয় হয়েছে। সম্প্রতি এ্যাকশন এইডের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্যফোরাম’, ‘শ্রমিক ফেডারেশনের’, ‘সাভারে গার্মেন্ট শ্রমিকদের স্কুল সংকলন পাঠশালা’র হিসাব মতে, এই দুর্ঘটনায় বাবা-মা হারানোর প্রায় ৫৮ শতাংশ শিশু স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর তথ্য মতে, প্রায় ৫ হাজার শ্রমিকের পরিবারে ৭০০ শিশু ছিল, যারা বর্তমানে হয় মা বা বাবা অথবা দাদি-নানির কাছে বেড়ে উঠছে। এ সংখ্যা আরও বেশি বলে তাদের ধারণা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর নিজেদের রাখা তথ্যমতে যে ৭০০ শিশু বাবা বা মাকে হারিয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় ২শ’ জনকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে নামকরা নানা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে বিজিএমইএ।
রানা প্লাজা ধসের তিন বছর পার হলেও এখনও ক্ষতিপূরণ নিয়ে চূড়ান্ত কোন সুরাহা হয়নি। যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাওয়া না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়া গত কয়েক বছরে যতটুকু অর্থ পাওয়া গেছে তা দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। আইএলও কনভেনশন ১২১ অনুযায়ী জীবিতদের ক্ষতি হিসাব করে ক্ষতিপূরণ হিসাব করা হবে। হতাহতদের ক্ষতিপূরণের জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে মিলে আইলওর নেতৃত্বে ৩০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয় (৩২০ কোটি টাকা)। সেখানে প্রায় ২৪ মিলিয়ন ডলার জমা পড়েছে। অর্থাৎ এখনও ঘাটতি আছে প্রায় ৬ মিলিয়ন ডলার। সমন্বয় কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, তহবিলের অভাবে শতভাগ ক্ষতিপূরণ দেয়া যাচ্ছে না। ৫ হাজার আবেদনের মধ্য থেকে বিভিন্ন বিবেচনায় ২৯০৯ জনকে বাছাই করা হয়। এখন পর্যন্ত ২৯০৯ জনকে আংশিক অর্থাৎ ৭০ শতাংশ দেয়া হয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দেয়া অর্থ দিয়েই এ তহবিল তৈরি হয়েছে। এত সর্বশেষ অর্থ দেয়ার ঘোষণা আসে ফ্যাশন ব্রান্ড বেনেটনের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দেয়া ২২ কোটি টাকা অনুদানও এই তহবিলের আওতায় ধরা হয়েছে। বিজিএমইএর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট শহিদুল্লাহ আজিম জানান, প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে তারা ২ কোটি টাকা দিয়ে দিয়েছেন এবং এ পর্যন্ত আহতদের চিকিৎসা খরচসহ ১৪ কোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছে।
সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ্যাকশন এইডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহত শ্রমিকদের ৫২ ভাগ কোন না কোন কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। তবে ৪৮ ভাগ শ্রমিক এখনও বেকার। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৫৫ ভাগ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষতিপূরণ দিতে মালিক, ক্রেতা, সরকার নানা সময় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ক্রেতারা যে টাকা দেয়ার কথা বলেছে, তারা বলছে সেটা দেয়া হয়ে গেছে। তবে শ্রমিকরা যে টাকা পেয়েছে, সেটা আসলে তাদের কাজে আসছে না। ক্ষতিপূরণে শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন সূত্রে জানা যায়, রানা প্লাজার পাঁচ কারখানায় পোশাক তৈরি করতে এমন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯। এর মধ্যে ১৬ প্রতিষ্ঠান তহবিলে অর্থ দেয়নি। আর যেসব ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দিয়েছে, তাদের বেশির ভাগেরই অল্প পরিমাণে। একমাত্র ব্যতিক্রম প্রাইমার্ক, ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রতিষ্ঠানটি দিচ্ছে ৯০ লাখ ডলার। এই অর্থ দিয়ে রানা প্লাজার দ্বিতীয় তলায় থাকা নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেডের ৫৮০ জন শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।
দেশের পোশাক খাত নিয়ে তিন বছর ধরেই মূল্যায়ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে উত্তর আমেরিকার ক্রেতাজোট এ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স সেফটি। এ মূল্যায়ন কার্যক্রমে সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে জোটটি বলেছে, কারখানাগুলোর শনাক্ত হওয়া ত্রুটির ৫১ শতাংশই এখনও মেরামতের মাধ্যমে সারিয়ে তোলা হয়নি। এছাড়া এখনও সঠিকভাবে অগ্নিবিপদ চিহ্নিত করতে পারেন না ৫৫ শতাংশ শ্রমিক। প্রোটেক্টিং এ্যান্ড এমপাওয়ারিং বাংলাদেশ’স গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স শীর্ষক এ অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এ্যালায়েন্স। মূল্যায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত পরিদর্শনের ভিত্তিতে কারখানা সংস্কার অগ্রগতি ও প্রশিক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকদের দক্ষতা বা সচেতনতার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে সংস্কার কার্যক্রম প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, প্রায় ৭০০ কারখানায় পরিদর্শন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বন্ধের জন্য ৩৬টি কারখানার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরকার মনোনীত রিভিউ প্যানেলের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি কারখানা নতুন ঠিকানায় স্থানান্তর হয়েছে। ১৩টি কারখানায় মেরামতের কাজ চলছে এবং ২২টি কারখানা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া ৭৭টি কারখানাকে ‘সাসপেন্ডেড’ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সংশোধন কার্যক্রম পূর্ণ করেছে ২৪টি কারখানা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কারখানা মেরামত কার্যক্রমের ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এ হিসাবে কারখানা মেরামতের ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ এখনও বাকি আছে। ৩৪টি কারখানার ত্রুটি সংশোধন অগ্রগতি শূন্য থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। ২০-৪০ শতাংশের মধ্যে সংস্কার অগ্রগতি আছে ১৪৩টি কারখানার। ২১৯টি কারখানার সংস্কার অগ্রগতি ৪০-৬০ শতাংশের মধ্যে। ৬০-৮০ শতাংশের মধ্যে সংস্কার অগ্রগতি আছে ১৪৮টি কারখানার। আর ৮০-১০০ শতাংশ সংস্কার অগ্রগতি আছে ৩৬টি কারখানার।
রানা প্লাজা ধসের ৩ বছর পূর্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবার ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস এ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের শ্রমিক নেতাকর্মীরা ১১ দফা দাবি জানিয়েছেন। ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা, রানা প্লাজার সামনে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, নিহত সকল শ্রমিকদের সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসন প্রদান, নিখোঁজ শ্রমিকদের অবিলম্বে খুঁজে বের করা এবং তাদের তালিকা প্রকাশ, আহত পঙ্গু শ্রমিকদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ প্রদান, হতভাগ্য শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা, বাসস্থান ও পুনর্বাসন, রানা প্লাজার জমি অধিগ্রহণ করে শ্রমিক কলোনি নির্মাণ ও তা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের কাছে হস্তান্তর, রানা প্লাজার ট্রাজেডির দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন নিশ্চিত করে শিল্প সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা করা, ছাঁটাই-নির্যাতন-দমন বন্ধ করা ও ক্ষতিপূরণ আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করার দাবি জানান।
৩ বছর পার হয়ে গেলেও নিহতদের পরিবার আহত শ্রমিক ও নিখোঁজদের স্বজনদের অনেকেই পাননি যথাযথ ক্ষতিপূরণ। রানা প্লাজার ৮ম তলার পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিল রূপালী আক্তার। তিনি জানান, ভবন ধসের ঘটনায় তিনি বুকে চাপ খেয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা এখানও ভাল হয়নি। রিক্সাচালক স্বামীর পক্ষে তার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয় না। তিনি কোন প্রকার আর্থিক সহায়তা পাননি। তার মতো আরও অনেকেই আছে যারা কোন সহযোগিতা পাননি।
রানা প্লাজা ধ্বংসস্তূপ এলাকায় জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দেয়া কাঁটা তারের বেড়া এখন আর নেই। অদৃশ্য কারণে কাঁটা তারের বেড়া ও খুঁটিগুলো সরিয়ে ফেলেছে একটি মহল। ধসে পড়া ভবনের সামনে অর্ধশত চায়ের দোকান ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রেন্ট-এ-কারের স্ট্যান্ড বসিয়ে টাকা আদায়ও করা হচ্ছে। ধসে পড়া ভবনের খালি জমিতে জমে থাকা পানিতে মাছ চাষ করেছে একটি চক্র। সন্ধ্যার পর থেকে স্থানটি এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। এ সকল ঘটনায় শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে।