Sylhet Today 24 PRINT

সরকারের অভিযোগ অস্বীকার, বাংলাদেশে জিহাদিদের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের শঙ্কা

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ৩০ এপ্রিল, ২০১৬

বাংলাদেশে সংঘটিত সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর জন্যে সরকার সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দায়ি করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানীয় উগ্রপন্থী বা আন্তর্জাতিক গ্রুপগুলো দায়ী। এ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় সহাবস্থানের দেশ বাংলাদেশে জিহাদিদের উত্থানের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে এক শুনানিতে এসব কথা বলেন। বার্তা সংস্থা এপি এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশে মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মী হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন যে কৌশলগত অবস্থানে থাকা ও ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় সহনশীলতার দেশ বাংলাদেশ ইসলামী চরমপন্থিদের দ্বারা হুমকির মুখে পড়েছে।  বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক, ব্লগার, বিদেশি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর রক্তাক্ত হামলার পেছনে আন্তর্জাতিক জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।

আল-কায়েদার ভারত উপমহাদেশের বাংলাদেশি শাখা দাবি করছে, গত সোমবার ইউএস-এআইডির কর্মী ও সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নানকে তারা হত্যা করেছে। তাদের এ দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে এর মধ্য দিয়ে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে স্থানীয় উগ্রপন্থীরা আল কায়েদা ও ইসলামী স্টেট গ্রুপের মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছে। আর বাংলাদেশে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের তিক্ত বিভক্তির সুযোগে এই উগ্রপন্থীরা নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে।

এ বিষয়ে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় শীর্ষ কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক হামলাগুলোর জন্য রাজনৈতিক বিরোধীদের দায়ী করলেও প্রাপ্ত তথ্য এমন আভাসই দেয় যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সম্পর্কিত উগ্রপন্থীরা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী।

হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে এই শুনানিতে ব্লিঙ্কেন আরো বলেন, ‘এসব ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশে আইএসের শেকড় গেড়ে বসতে পারার সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন করে। কোনোভাবেই এটা আমরা চাই না।’

এপির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সংখ্যালঘু ও মধ্যপন্থীদের ওপর এসব হামলা শুরু হয় ২০১৩ সালে। সাধারণত ছুরি বা চাপাতিধারী তরুণরা এসব হামলা চালিয়ে আসছে। এরপর থেকে এসবের বিস্তার কেবল বেড়েছে। হতাহতদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশি-আমেরিকান লেখক অভিজিৎ রায়। তাঁকে ঢাকার একটি সড়কে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হত্যা করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে যে অন্যরাও জঙ্গিদের হত্যার হুমকিতে আছে। কারণ সরকার তাদের দুর্দশা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। কারণ সরকার হয়তো কিছু ব্লগারের নাস্তিক্যবাদী লেখালেখিতে ক্ষুব্ধ মুসলিমদের সমর্থন হারাতে চায় না। কর্তৃপক্ষ কিছু মামলায় কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে। কিন্তু এদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ এখনো মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে পারেনি।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে যে যুক্তরাষ্ট্র ঝুঁকিতে থাকা কয়েকজন ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এখনো স্পষ্ট নয় যে, এটি আদৌ করা হবে কি না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো গত ডিসেম্বরে থেকে এ আহ্বান জানিয়ে আসছে।

ওয়াশিংটনের জন্য আরো বড় উদ্বেগ হলো, ধর্মীয় চরমপন্থিদের জন্য বাংলাদেশ উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। অবশ্য বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তমতের ঐতিহ্য, খ্রিস্টান ও হিন্দু সংখ্যালঘুদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাস ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিতে সফলতা রয়েছে। ওয়াশিংটন বিশ্বব্যাপী আইএস জঙ্গিদের মোকাবিলায় হিমসিম খাচ্ছে।

হেরিটেজ ফাউন্ডেশন নামে মার্কিন একটি থিঙ্কট্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ লিসা কার্টিস বলেন, ‘বাংলাদেশ সব সময় এমন একটি দেশ ছিল, যেটিকে আমরা একটি আদর্শ মুসলিম গণতন্ত্রেও দেশ হিসেবে তুলে ধরেছি। এখন মনে হচ্ছে, সে জায়গা থেকে ক্রমেই পিছু হটছে দেশটি।’ তিনি বর্তমান হত্যাযজ্ঞকে বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশি সমাজের স্বাভাবিক রূপকে পালটে দেওয়া বা একে ইসলামীকরণ করার চেষ্টা হিসেবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছেন হাসিনা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে ক্রমেই কোণঠাসা করেছেন। এ দলটি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন বয়কট করেছিল। তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেন। এতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নৃশংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামী দলের কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড হয়। এ দলটি বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়।

বিরোধী দলগুলো সাম্প্রতিক এসব হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। তারা বলছে, নিরাপত্তা ব্যর্থতা ঢাকতে তাদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছে সরকার। জুলহাজ মান্নান হত্যার জন্যও বিরোধীদের দায়ী করেছেন হাসিনা। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই, আল-কায়েদা অন দ্য ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টের সহযোগী আনসার-আল-ইসলাম জানায়, তারাই ওই অ্যাক্টিভিস্ট ও তাঁর অভিনেতা বন্ধুকে হত্যা করেছে। কারণ হিসেবে এ গ্রুপটি বলেছে যে তারা ছিল বাংলাদেশে সমকামিতার প্রচারণা ও চর্চার অগ্রদূত।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, কাউন্টার-টেরোরিজম ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে বাংলাদেশকে তারা ভালোভাবে সহায়তা করছেন। তারা এও বলেন, বাংলাদেশ আন্তদেশীয় জিহাদি গ্রুপগুলোর সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করলেও সাম্প্রতিক কয়েক মাসে মার্কিন ও বাংলাদেশি কর্মকর্তারা এসব নিয়ে বৈঠকে বসেছেন। এসব বৈঠকে দেশে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর গেড়ে বসার ঝুঁকি কমানো নিয়ে আলোচনা হয়। তবে আল-কায়েদা ও আইএস উভয়েই পরিষ্কার করে জানান দিয়েছে তারা বাংলাদেশে অবস্থান পোক্ত করতে চায়।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.