নিজস্ব প্রতিবেদক | ১১ মার্চ, ২০১৫
প্রখ্যাত বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার উপর হামলার সময় এই এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখছিলো বলে জানিয়েছেন বন্যা ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রাফিদা আহমেদ বন্যা বলেন - “যখন অভিজিৎ ও আমার ওপর নৃশংসভাবে হামলা হচ্ছিল তখন পুলিশ কাছেই ছিল এবং তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”
বন্যা লিখেন- ধর্মান্ধতা , মৌলবাদ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখার কারনে অভিজিতের উপর হামলার হুমকি ছিলো। ধর্মীয় মৌলবাদিদের সমালোচনা করেছিলেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বন্যা।
মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ড. অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদ বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারের পর দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে হত্যার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান, একই সঙ্গে হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিশেষ সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ হত্যার সেই দিনটির স্মৃতিচারণ করেন তিনি। উল্লেখ করেন হত্যাকাণ্ডের সময় পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে সঙ্গে নিয়ে একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় তাদের ওপর হামলা হয়। ঘটনার পরপরই তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিজিৎ। এরপর সেখান থেকে আহত বন্যাকে নেয়া হয় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে। ৩ মার্চ বন্যা উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান।
অভিজিৎ রায় এবং বন্যা দু'জনই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। অভিজিৎ হত্যা তদন্তে সহায়তা করতে গত ৪ মার্চ ঢাকায় আসেন এফবিআই কর্মকর্তা ড্যান ক্লেগ, জাগদীপ সিং, ত্রিক্রস ও উইলিয়াম। চার সদস্যের এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উইলিয়াম। সন্ত্রাসীরা যখন অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করার পর একজন আলোকচিত্রী যখন সেদিন তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বারবারই জ্ঞান হারাচ্ছিলেন বন্যা।
এসব হুমকিকে তারা কতটুকু গুরুত্বের সাথে দেখতেন এমন প্রশ্নে তার স্ত্রী বলেন, হত্যার হুমকি মূলত ছিল ফারাবি নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঐ ব্যক্তিকে ‘ব্লক’ করার কথাও জানান বন্যা।
তিনি বলেন, এ ধরনের হুমকি অনেক বুদ্ধিজীবী ও লেখককেই দেয়া হয়েছে যার দু’একটিই এপর্যন্ত কার্যকর করা হয়েছে।
হত্যার হুমকি নিয়ে বাংলাদেশে এসে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও ভেবেছিলেন বলে উল্লেখ করে অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বলেন, 'বই মেলা থেকে টিএসসির মোড় পর্যন্ত এইটুকু পথে এত মানুষের মধ্যে এরকম একটি হামলা হতে পারে বলে এটি কল্পনার বাইরে ছিল।'
বন্যার ফেসবুক স্ট্যাটাস:
‘আমি সত্যিকার অর্থে প্রশংসা করছি বাংলাদেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায় যেভাবে সমর্থন প্রকাশ করেছেন তার জন্যে। যেহেতু আমরা ন্যায় বিচারের দিকে ধাবিত হচ্ছি তাই বিবিসি এবং সেণ্টার ফর ইনকোয়ারিকে দেয়া আমার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যাৎকার সবাইকে শেয়ার করার জন্য উৎসাহিত করছি।
আমার স্বামী অভিজিৎ রায় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ নিয়ে লিখেছেন এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের সমালোচনা করেছেন। এ কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ আর আমি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক জনবহুল এলাকায় হামলার স্বীকার হয়েছিলাম। আমি তার স্ত্রী, সমমনা লেখক ও একজন মুক্তমনা হিসেবে ভয়ানক এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঐতিহাসিকভাবেই প্রগতিশীল আন্দোলনের সূতিকাগার। এখানেই অভিজিৎ বেড়ে উঠেছে। হুমকি সত্ত্বেও আমরা মনে করছি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এ ধরণের ভয়ানক ঘটনা ঘটতে পারে না। অপরাধ কখনও কেবল ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয় না, এটা বাক স্বাধীনতা ও মানবতার বিরুদ্ধে। যখন অভিজিৎ ও আমাকে নির্মমভাবে কোপানো হচ্ছিল তখন পাশেই পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল। অথচ তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় নি। এখন আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে দিতে সর্বোচ্চে শক্তি প্রয়োগের দাবি জানাই।
আমি বিশ্বাস করি না, হত্যাকারীদের ধরলেই সবকিছু হয়ে যায়। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা এবং লেখকদের হত্যা করেও হত্যাকারীর বিচার হয় না এই ধরণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে আমি সরকারকে আহ্বান করছি। এ ঘটনার ন্যায় বিচার পাওযার জন্য বিশ্ববাসীকে আমাদের সাথে যোগদানের আহবান জানাই’।
বন্যার বক্তব্যের অডিও লিঙ্ক- https://soundcloud.com/bbc-world-service/rafida-bonya-ahmed-murdered-blogger-avijit-roys-wife-i-will-not-be-quiet