Sylhet Today 24 PRINT

বাজেটের ‘বরপুত্র’ মুহিত

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০২ জুন, ২০১৬

এবার হলে হবে টানা আটবার, এরআগে এমনটি আর কেউ করতে পারেনি। আজকেই নিজের রেকর্ড নিজে ভাঙ্গতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আজ টানা অষ্টমবারের মতো বাজেট ঘোষণা করবেন তিনি। এরআগে টানা ছয়টির বেশি বাজেট দিত পারেননি কোনো অর্থমন্ত্রী। মুহিত যেনো বাজেটের 'বরপুত্র'।

‘প্রবৃদ্ধি সঞ্চারে নতুন মাত্রার’ লক্ষ্য নিয়ে আজ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আর এরই মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে টানা বাজেটের রেকর্ডও গড়তে যাচ্ছেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতই প্রথম অর্থমন্ত্রী যিনি টানা ৮ বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত ৮টি বাজেট এবং তার আগে ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিলেন মুহিত।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা দ্বিতীয় মেয়াদের তৃতীয় বাজেট আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এবারেরটিসহ মোট ১০টি বাজেট দিচ্ছেন তিনি।

তবে সবচেয়ে বেশি বাজেট দেয়ার রেকর্ড গড়েন আরেক প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের। তিনি মোট ১২টি বাজেট দিয়েছেন। এছাড়া প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া একাধারে ছয়টি বাজেট দেন।

প্রসঙ্গত, আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালে সিলেটের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা। মুহিত পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট নেতা, তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের তৃতীয় সন্তান। তার মা সৈয়দ শাহার বানু চৌধুরীও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডসহ রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। মুহিত ছাত্রজীবনে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও মেধাবী ছিলেন।

তিনি ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে তৎকালীন সারা প্রদেশে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এমএ পাস করেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস-এ (সিএসপি) যোগদানের পর জনাব মুহিত তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার, পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব্ পালন করেন। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তিনি পরিকল্পনা সচিব এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন।

মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের চিফ ও উপসচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বৈষম্য বিরাজমান ছিল তার ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা পালনে পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এটিই ছিল এবিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন। ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১-এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন।

অর্থনৈতিক কূটনীতিতে মুহিত বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় তিনি একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব।

১৯৮১ সালে চাকরি থেকে সেচ্ছায় অবসর নিয়ে তিনি অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরামর্শক হিসেবে ফোর্ড ফাউণ্ডেশন ও ইফাদে কাজ শুরু করেন। ১৯৮২ সালের মার্চ মাস থেকে ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে উড্রো উইলসন স্কুলে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন।

লেখক হিসেবেও জনাব মুহিত সমান পারদর্শী। মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনৈতিক সমস্যা বিষয়ক গ্রন্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার ২৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের তিনি একজন পথিকৃৎ। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন এবং এর পূর্বসুরি ‘পরশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

মুহিত বিবাহিত। স্ত্রী সৈয়দ সাবিয়া মুহিত একজন বিশিষ্ট ডিজাইনার। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম কন্যা বেগম সামিনা মুহিত একজন ব্যাংকার এবং মুদ্রানীতি ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিউইয়র্কে, জ্যেষ্ঠপুত্র সাহেদ মুহিত স্থপতি ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। কনিষ্ঠ পুত্র সামির মুহিত টেক্সাসের হিউস্টনে শিক্ষকতা করছেন।

২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে আবুল মাল আবদুল মুহিত।

স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সাল থেকে এ নিয়ে ৪৫টি বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে বিভিন্ন সরকার। এর মধ্যে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে ৩৫টি বাজেট প্রস্তাবনা। সামরিক সরকার এবং সর্বশেষ তত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১০টি বাজেট দেয়া হয়েছে। এগুলো দেয়া হয় খন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এবং সেনাসমর্থিত ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে।

আগামী সাধারণ নির্বাচনের নির্ধারিত সময় ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকলে বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপনেও প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের মাইলফলক স্পর্শ করবেন আবুল মাল আবদুল মুহিত।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.