সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৫ জুন, ২০১৬
এক যুগ আগে গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল ও আবেদনের ওপর বুধবার দুপুরে রায় দেবেন হাই কোর্ট।
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাই কোর্ট বেঞ্চ ৮ জুন এসবের ওপর শুনানি শেষে ১৫ জুন রায়ের দিন ঠিক করে দেন।
এর মধ্য দিয়ে এক যুগ আগে ঘটে যাওয়া ওই হত্যাকাণ্ডের বিচারের পরিসমাপ্তি হাই কোর্টে শেষ হতে যাচ্ছে। গত ১৪ জানুয়ারি থেকে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও ফৌজদারি বিবিধ আবেদনের উপর হাই কোর্টে শুনানি শুরু হয়ে ৩৪তম দিনে ৮ জুন শুনানি শেষ হয়।
শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, “ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সেগুলো বহাল থাকবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।”
২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায় আহসান উল্লাহ মাস্টারকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। তার সঙ্গে খুন হন ওমর ফারুক রতন নামে আরেকজন।
মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহ মাস্টার ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে টঙ্গী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি গাজীপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য এই সদস্য ছিলেন এলাকায় জনপ্রিয় নেতা।
জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি আহসান উল্লাহ মাস্টারের মৃত্যুর পর এখন তার ছেলে জাহিদ আহসান রাসেল ওই আসনের সংসদ সদস্য।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রোনা নাহরীন ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মনজু নাজনিন। আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ কয়েকজন আইনজীবী।
বিচার প্রক্রিয়া
২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায় আহসান উল্লাহ মাস্টারকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ঘটনার পরদিন আহসান উল্লাহ মাস্টারের ভাই মতিউর রহমান টঙ্গী থানায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
এ মামলায় ওই বছরের ১০ জুলাই ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। একই বছরের ২৮ অক্টোবর ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষে ৩৪ জন এবং আসামিপক্ষে দু’জন সাক্ষ্য দেন।
এরপর বিচার শেষে ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল বিচারিক আদালত নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ও ২ জনকে খালাস দেন।
আইনজীবীদের দেওয়া তথ্যমতে, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ২ জন মারা গেছেন, ১৭ জন কারাগারে, বাকি ৯ জন পলাতক রয়েছেন।
পরে বিচারিক আদালতের রায়ের বিষয়ে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল হয়।
গত ২১ জানুয়ারি থেকে এ আপিল মামলার শুনানি শুরু হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, নুরুল ইসলাম সরকার, নুরুল ইসলাম দিপু (পলাতক), মোহাম্মদ আলী, মাহবুবুর রহমান মাহবুব, আমির হোসেন, সৈয়দ আহমেদ হোসেন মজনু (পলাতক), জাহাঙ্গীর ওরফে বড় জাহাঙ্গীর, শহীদুল ইসলাম শিপু, হাফিজ ওরফে কানা হাফিজ, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু (পলাতক), ফয়সাল (পলাতক), সোহাগ ওরফে সরু, লোকমান হোসেন ওরফে বুলু, আল আমিন (মারা গেছেন), রতন মিয়া ওরফে বড় মিয়া, রনি মিয়া ওরফে রনি ফকির (পলাতক), জাহাঙ্গীর (পলাতক), রতন ওরফে ছোট রতন (মারা গেছেন), আবু সালাম ওরফে সালাম, মশিউর রহমান ওরফে মনু (পলাতক), খোকন (পলাতক) ও দুলাল মিয়া ।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছয় আসামি হলেন- রাকিব উদ্দিন সরকার পাপ্পু, আইয়ুব আলী, জাহাঙ্গীর, নুরুল আমিন, মনির ও অহিদুল ইসলাম টিপু (পলাতক)।
খালাস পান কবির হোসেন ও আবু হায়দার ওরফে মিরপুরইয়া বাবু।
আহসান উল্লাহ মাস্টার এক নজরে
১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর গাজীপুরে জন্মগ্রহণ করেন আহসান উল্লাহ মাস্টার। ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করে তৎকালীন কায়েদে আযম কলেজে (বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ) একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। ১৯৭০ সালে ডিগ্রি পাস করার পর তিনি টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
এর আগে ছয় দফা ও ১১ দফাসহ বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি।
১৯৮৩ ও ১৯৮৮ সালে দু’বার পুবাইল ইউপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আহসান উল্লাহ মাস্টার। পরে ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আহসান উল্লাহ মাস্টার গাজীপুর-২ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালের ৭ মে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হন আহসানউল্লাহ মাস্টার।
দণ্ডিত আসামিরা
মামলার পেপারবুক থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, আহসান উল্লাহ মাস্টার ও ওমর ফারুক রতন হত্যা ও পরিকল্পনার দায়ে বিচারিক আদালতের রায়ে ২২ আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামি হলেন-নুরুল ইসলাম সরকার, নুরুল ইসলাম দিপু (পলাতক), মোহাম্মদ আলী, মাহবুবুর রহমান মাহবুব, আমির হোসেন, সৈয়দ আহমেদ হোসেন মজনু (পলাতক), জাহাঙ্গীর ওরফে বড় জাহাঙ্গীর, শহীদুল ইসলাম শিপু (পলাতক), হাফিজ ওরফে কানা হাফিজ (পলাতক), আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু (পলাতক), ফয়সাল (পলাতক), সোহাগ ওরফে সরু, লোকমান হোসেন ওরফে বুলু (পলাতক), আল আমিন (পলাতক), রতন মিয়া ওরফে বড় মিয়া (পলাতক), রনি মিয়া ওরফে রনি ফকির(পলাতক), জাহাঙ্গীর (পলাতক), রতন ওরফে ছোট রতন (পলাতক), আবু সালাম ওরফে সালাম (পলাতক), মশিউর রহমান ওরফে মনু (পলাতক), খোকন (পলাতক), দুলাল মিয়া (পলাতক)।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছয় আসামি হলেন-রাকিব উদ্দিন সরকার ওরফে পাপ্পু, আইয়ুব আলী, জাহাঙ্গীর, নুরুল আমিন, মনির ও অহিদুল ইসলাম টিপু (পলাতক)।
খালাস পান কবির হোসেন ও আবু হায়দার ওরফে মিরপুরইয়া বাবু।
পলাতক ৮, দুজনের মৃত্যু
রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২২ আসামির মধ্যে আট আসামি পলাতক ও দুজন মারা গেছে।
পলাতক আটজন হলেন-নুরুল ইসলাম দিপু, সৈয়দ আহমেদ হোসেন মজনু, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু, ফয়সাল, রনি মিয়া ওরফে রনি ফকির, মরকুনের জাহাঙ্গীর, মশিউর রহমান ওরফে মশু ও খোকন।
এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ছয় আসামির মধ্যে এক আসামি অহিদুল ইসলাম টিপু পলাতক।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি ছোট রতন ও আল আমিন মারা গেছেন।