Sylhet Today 24 PRINT

ব্লগার রাজীব হত্যার চার্জশিট: রাহমানিসহ ৮ অভিযুক্ত

নিউজ ডেস্ক  |  ১৮ মার্চ, ২০১৫

ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক থাবা বাবা ওরফে আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যা মামলায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন রাহমানি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাত ছাত্রসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছেন আদালত।

আগামী ২১ এপ্রিল থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর দিন ধার্য করা হয়েছে। বুধবার (১৮ মার্চ) ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ রুহুল আমীন এ চার্জ গঠন করেন।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন রাহমানি ছাড়া অন্য অভিযুক্তরা হলেন, ঢাকার খিলক্ষেত চৌধুরীপাড়ার মো. ফয়সাল বিন নাঈম দীপ (২২), ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার পোড়াপাড়া গ্রামের মো. এহসান রেজা রুম্মান (২৩), ঢাকার কেরাণীগঞ্জ থানার ধলেশ্বর গ্রামের মাকসুদুল হাসান অনিক (২৩), ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কলেজপাড়ার নাঈম ইরাদ (১৯), চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার হারামিয়া গ্রামের নাফিজ ইমতিয়াজ (২২), ঢাকার কলাবাগান থানার ভুতের গলির সাদমান ইয়াছির মাহমুদ (২০) ও ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার জয়লস্করের রেদোয়ানুল আজাদ রানা(৩০)। 

তারা নর্থ সাউথের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। রেদোয়ানুল আজাদ রানা ছাড়া বাকি ছয়জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আটক রয়েছেন। পলাতক রানাকে রাজীব হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সাতজনকেই বহিষ্কার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদেরকে আদালত দোষী না নির্দোষ জিজ্ঞাসা করলে তারা নিজেদেরেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। 

মামলায় ৫৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন, মামলার বাদী ও নিহতের বাবা ডা. নাজিম উদ্দিন, হত্যাকাণ্ডস্থলের আশপাশের লোকজন, পুলিশ ও চিকিৎসক। আগামী ২১ এপ্রিল থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর দিন ধার্য করেছেন আদালত।

চার্জশিটে বলা হয়, জসীমউদ্দিন রাহমানির বই পড়ে এবং সরাসরি তার বয়ান ও খুতবায় অংশ নিয়ে ‘নাস্তিক ব্লগার’দের খুন করতে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হন আধুনিক শিক্ষার এই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ব্লগার রাজীব খুন হন। রাহমানিকে রাজিব হত্যাকাণ্ডে উৎসাহদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

গত ৭ মার্চ ব্লগার রাজীব হত্যা মামলায় চার্জ গঠনের শুনানি শেষ হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট আবু আবদুল্লাহ। আসামিপক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন কাজল, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা, অ্যাডভোকেট এম এ খায়রুল হক লিটন ও অ্যাডভোকেট মো. ফারুকসহ অন্যান্য আইনজীবীরা।

গত বছরের ২৮ জানুয়ারি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাত ছাত্রসহ আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক নিবারন চন্দ্র বর্মণ।

মুফতি মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন রাহমানিকে ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। সাদমান ইয়াছির মাহমুদকে একই বছরের ২০ আগস্ট ও বাকিদের ১০ মার্চ গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। 

গ্রেফতার হওয়ার পর ২০১৩ সালের ১০ মার্চ রাজীব হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ৫ ছাত্র ফয়সাল বিন নাঈম দীপ,  এহসান রেজা রুম্মান, মাকসুদুল হাসান অনিক, নাঈম ইরাদ ও নাফিজ ইমতিয়াজ ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। 

১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিতে আসামিরা রাজীর হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসাবে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রানার নাম প্রকাশ করেন। রানাই তাদের ব্লগার রাজীবকে হত্যার জন্য মোটিভেট করেন। 

মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানি স্বীকারোক্তিতে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার না করলেও অপরাপর স্বীকারোক্তিকারী আসামিরা রাহমানি রাজীবকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
জবানবন্দিতে আসামিরা স্বীকার করেন- নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামাজ কক্ষে নামাজ পড়তে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হন তারা। সে সময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রানা তাদের জানান, জনৈক ব্লগার ‘থাবা বাবা’ ইসলাম ও মহানবী (স.) এর নামে বাজে কথা লিখছেন। থাবা বাবাকে হত্যার জন্য রানা তাদের উদ্বুদ্ধ করেন। সেই মোতাবেক থাবা বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। এ জন্য তারা দু’টি গ্রুপ তৈরি করেন। একটি ‘ইনটেল’ গ্রুপ ও অন্যটি ‘এক্সিকিউশন’ গ্রুপ। প্রত্যেক গ্রুপে তিনজন করে ছয়জন সদস্য ছিলেন।  

আসামিরা রাজীবের ব্লগ ও ফেসবুকে ঢুকে থাবা বাবা ওরফে রাজীবের সংক্রান্ত তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ফেসবুকেই তারা জানতে পারেন, শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে আসবেন রাজীব।

রাজীব শাহবাগে এলে ‘ইনটেল গ্রুপ’ তাকে শনাক্ত করেন। এরপর গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা রাজীবকে রেকি করা শুরু করেন। 

রাজীবকে চেনার পর ওইদিন ইনটেল গ্রুপের দুই সদস্য রাজীবের সঙ্গে বাসে ওঠেন ও একজন সাইকেলযোগে বাসে ওঠা রাজীবকে অনুসরণ করে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত যান এবং রাজীবের বাসা চিনে আসেন। 

রাজীবের বাসা চিহ্নিত করার পর ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে নিয়মিত রেকি করা শুরু করেন। এ সময় তারা রাজীবকে হত্যার জন্য ঢাকার নর্দা থেকে চাপাতি-ছুরি ও নতুন মোবাইলের সিম ও সেট কেনেন। 

প্রস্তুতি শেষে ঘটনার দিন এক্সিকিউশন গ্রুপের সদস্যরা বিকাল ৪টার দিকে পল্লবীর পলাশনগরে অবস্থিত রাজীবদের বাসার গলিতে অবস্থান নেন। তারা স্কুলব্যাগ, ক্রিকেটের ব্যাট ও বল ইত্যাদি সঙ্গে রাখেন। ক্রিকেট খেলার নামে তারা বল ইচ্ছাকৃতভাবে রাজীবদের বাসায় ফেলে দেন এবং বল আনার নাম করে পুনরায় নিশ্চিত হন, সেটি রাজীবের বাসা কিনা। 

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পৌনে আটটার দিকে রাজীব যখন পল্লবীর বাসার দিকে যাচ্ছিলেন তখন ইনটেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে অনুসরণ করেন। রাজীব বাসার গেটের কাছাকাছি পৌঁছার পর এক্সিকিউশন গ্রুপের রানা তাকে রিকশা থেকে ধাক্কা দেন এবং ফয়সাল বিন নাঈম দীপ চাপাতি দিয়ে দেহ থেকে মস্তক আলাদা করার জন্য কোপ দেন। 

এতে আহত হয়ে রাজীব চিৎকার করে দেয়ালের ওপর পড়ে যান। তারপর ফয়সাল রাজীবকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। আসামি অনিকও তার হাতে থাকা ছোরা দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন।

এ সময় কেউ একজন খুন খুন বলে চিৎকার করলে আসামিরা দ্রুত পালিয়ে যান।

রাজীবকে হত্যা করার সময় আসামি দীপের এলোপাতাড়ি কোপের একটি কোপ অনিকের পায়ের জুতোয় লাগে। এতে তার পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের কিছু অংশ কেটে যায়। পরে অনিক রুম্মানের সঙ্গে কাকরাইল এলাকায় জুতাজোড়া খুলে জাতীয় চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদফতরের পুকুর পাড়ে ফেলে চলে যান।

পুলিশ আসামিদের গ্রেফতারের পর সেই জুতাজোড়া ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতি ও চারটি ছোরা শেরেবাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রাস্তার পাশে ড্রেনের মধ্যে থেকে উদ্ধার করে। 

শাহবাগ আন্দোলন শুরুর ১০ দিনের মাথায় ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরের বাসার সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় স্থপতি রাজীব হায়দারকে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা ডা. নাজিম উদ্দিন ঢাকার পল্লবী থানায় এ মামলাটি দায়ের করেছিলেন। 

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.