সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৯ জুন, ২০১৬
পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তার ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার শ্বশুর সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেছেন, মিতু হত্যার প্রকৃত খুনিদের সন্ধানের বদলে বাবুলকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। মিতু হত্যার তদন্ত যাতে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না করা হয় সেই দাবি জানান তিনি।
মোশাররফ হোসেন জানান, বাবুলকে ডিবি অফিসে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর থেকে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বাসায় যে পুলিশ প্রহরা ছিল তা তুলে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সাদা পোশাকে কিছু লোকের অবস্থান তারা লক্ষ করছেন। ফলে তারা বাসার বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
মঙ্গলবাল দুপুরে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন তিনি।
এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার পর গত শুক্রবার পর্যন্ত পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত খুনিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারছিল না। কিন্তু শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে বাবুলকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলতে থাকে। সংবাদমাধ্যমে এমনও খবর আসে মিতু হত্যায় বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি মিতু হত্যার মূল পরিকল্পনা হিসেবেও সন্দেহের তীর ছোটে বাবুলের দিকে।
তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ তার শ্বশুর সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, “আমার মেয়ের সঙ্গে বাবুলের বিয়ে হয়েছে এক যুগের বেশি আগে। তাদের মধ্যে যদি দ্বন্দ্ব থাকত, তাহলে আমরা দুই ফ্যামেলির কেউ না কেউ নিশ্চয় জানতাম। সে রকম কিছুই এত দিন হয়নি। তাহলে কেন আমরা জামাইকে (বাবুল) সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে রাখব।”
বাবুলের শ্বশুর বলেন, “আমা্র মেয়েকে হত্যা করা হলো। আমি কতটা ব্যথিত সেটা ভাষায় বোঝানো যাবে না। আমি মেয়ে হত্যাকারীদের বিষয়ে জানতে চাই। কারা আমার মেয়েকে হত্যা করল, সেটা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান কাজ হওয়া উচিত। কিন্তু সেটা না করে আমাকে উল্টো প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে। আমার দুটি নাতি মানসিক সমস্যায় ভুগছে। ওদের নিয়ে কীভাবে সামনে এগুব তা নিয়ে কেউ ভাবছে না। সবাই বাবুল আক্তারকে ফাঁসানো নিয়ে আছে। এটা খুবই দুঃখজনক। আমার দাবি, মিতু হত্যার তদন্ত যেন ভিন্ন দিকে প্রবাহিত না করা হয়।”
নিরাপত্তা শঙ্কার অভিযোগ তুলে মোশাররফ হোসেন বলেন, “সোমবার বাসার সামনে থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশ তুলে নেয়া হলেও সাদা পোশাকে অনেকেই বাসার সামনে পাহারায় আছে। এসব কিসের আলামত?”
নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগছেন জানিয়ে সাবেক এই পুলিশ পরিদর্শক বলেন, “বাইরে বের হতে ভয় হয়। মিতুর দুই সন্তানকে মনোরোগ চিকিৎসক দেখানো যাচ্ছে না। কারণ বাইরে যাওয়াটাই এখন রিস্ক।”
বাবুল আক্তারকে ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে অনেক কথাই গণমাধ্যমে এসেছে। এর মধ্যে তাকে চাকরি ছেড়ে দেয়ার প্রসঙ্গ আছে। জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমি মেয়ে হারিয়েছি। আর বাবুল তার স্ত্রী হারিয়েছে। দুই সন্তান তার মাকে হারিয়েছে। এখানে চাকরি থেকে সরে যেতে হবে- এমন প্রশ্ন আসবে কেন? এখন তো প্রশ্ন হবে খুনিকে ধরা নিয়ে।”
মিতুর বাবা বলেন, “বাবুলকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সব কথা চাইলেও বলা যায় না। আমরা অনেক বিষয়ে এখন মন্তব্য করতে পারছি না। তবে পরিবেশ এলে সবকিছুই পরিষ্কার হবে।”
“সত্য প্রকাশ হবেই। সময় হলেই তা প্রকাশ হবে। ষড়যন্ত্র বেশি দিন টেকে না। সময়টা এখন খারাপ গেলেও ভালো হতেও সময় লাগে না।” যোগ করেন পুলিশের সাবেক এই পরিদর্শক।
বাবুলের শ্বশুরবাড়িতে নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে খিলগাঁও থানার ওসি মাঈনুল ইসলাম বলেন, “এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে পারব না। এ নিয়ে ডিএমপির মিডিয়া শাখা কথা বলবে।”
গত ৫ জুন চট্টগ্রামে স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু খুন হওয়ার পর দুই সন্তানকে ঢাকায় নিয়ে আসেন কয়েক মাস আগে বন্দরনগরী থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি হয়ে আসা বাবুল। এখন মেরাদিয়ার ওই বাড়িতে থাকছেন বাবুল। সেখানে তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, শ্যালিকা ও তার স্বামী রয়েছেন।
গত শুক্রবার মধ্যরাতে এই বাড়ি থেকেই পুলিশ আকস্মিকভাবে বাবুলকে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু পরদিন শনিবার পর্যন্ত তার অবস্থান সম্পর্কে ধুয়াশা তৈরি হলে নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলে। শনিবার বিকাল পর্যন্ত বাবুলের ফোন বন্ধ থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে তার শ্বশুরসহ স্বজনরা। পরে ওই দিন বিকালে বাবুলকে বাসায় পৌছে দেয় পুলিশ। এ সময় বাবুল জানান, তদন্তের বিষয়ে বাদী হিসেবে তার সঙ্গে ‘আলোচনা’হয়েছে।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ঢাকার পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া মামলার বাদী হিসেবে বাবুলকে তদন্তের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বললেও চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, বাবুলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, তবে এটাকে জিজ্ঞাসাবাদ বলা যায় না।
কী নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ- তা নিয়ে পুলিশের রাখঢাকের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসায় বলেন, মিতুর সন্দেহভাজন যে দুই খুনিকে ধরা হয়েছে, তা যাচাইয়ের জন্য বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে আজ মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুলের সংশ্লিষ্টতার বিষয় এখনো আসেনি।’
বাবুলও তাকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো কথা বলছেন না বলে জানান মোশাররফ হোসেন।
মোশাররফ বলেন, “ডিবি অফিস থেকে ফেরার পর বাবুল এক দিনও বাসার বাইরে যায়নি। তাকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। কারও সঙ্গে সে কথা বলে না। রুমেই কাটে তার দিনরাত।”
মিতু হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ প্রথমে ধারণা করেছিল, চট্টগ্রামে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেই বাবুলের স্ত্রীকে খুন করা হয়। তবে গত শনিবার ওয়াসিম ও আনোয়ার নামের দুজন গ্রেপ্তার পর সেখান থেকে কিছুটা সরে এসে বলা হচ্ছে, সন্দেহভাজন যে দুই খুনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা পেশাদার অপরাধী। তারাই মিতুকে খুন করেছে বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
তবে কী কারণে, কার পরিকল্পনায় মিতুকে হত্যা করা হলো, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো খোলাসা করেনি। তবে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার জানান, তদন্ত শেষ হলেই এ বিষয়ে সবকিছু জানানো হবে।