সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৯ জুন, ২০১৬
এসপি বাবুল আক্তার ছিলেন মাদক, অস্ত্র আর সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটের জন্য বড় এক আতংক। দফায় দফায় সাহসী অভিযান পরিচালনা করে তিনি এসব সিন্ডিকেটের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। আর এতেই চোরাচালান সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী গডফাদারদের টার্গেটে পরিণত হন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, তার পেশার মধ্যে কিছু অদৃশ্য শত্রু বা প্রতিপক্ষ গ্রুপও তৈরি হয়েছিল। যারা চোরাচালান সিন্ডিকেটের কাছ থেকে বড় ধরনের সুবিধা পেয়ে আসছিল। এখন মিতু হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ এসপি বাবুল আক্তারের এসব শত্রুপক্ষের বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান শুরু করেছে। খতিয়ে দেখা হচ্ছে মিতু হত্যাকাণ্ডের পেছনে বাবুল আক্তারের শত্রুপক্ষের কোনো যোগসাজশ আছে কিনা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে কথা বলে এ ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বাবুল আক্তারের পারিবারিক জীবন সত্যিই কেমন ছিল তাও অনুসন্ধান থেকে বাদ পড়ছে না। জানার চেষ্টা করা হচ্ছে স্ত্রী মিতুর সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন কেমন ছিল।
জানা গেছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোটা অংকের মাসোয়ারা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান সিন্ডিকেটগুলো নির্বিঘ্নে তাদের অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় যোগ দিয়েই তিনি এসব সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করেন। এর আগে বাবুল আক্তার তার বিশ্বস্ত চার কর্মকর্তাকে (এসআই পদমর্যাদার) সিএমপির গোয়েন্দা শাখায় বদলি করিয়ে আনেন।
অন্যদিকে এর আগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) হিসেবে কর্মরত অবস্থায় পুরনো বিশ্বস্ত সোর্সদের মাধ্যমে তথ্য নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন। আর এতে বন্ধ হয়ে যায় অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অংকের মাসোয়ারা। বিশেষ করে ওই সময়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত এক কর্মকর্তা এসপি বাবুলের (তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। অন্যদিকে অবৈধ চোরাচালান সিন্ডিকেটের টার্গেটে পড়েন বাবুল আক্তার। তবে বাবুল আক্তারও কম যান না। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তৎকালীন সিএমপির আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। বাবুল আক্তারের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই কর্মকর্তাকে পুলিশের অপর একটি ইউনিটে বদলি করা হয়। আর এতে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসপি হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর বাবুল আক্তার যাতে চট্টগ্রাম থাকতে না পারেন নেপথ্যে ওই চক্রটি সেই ষড়যন্ত্র করতে থাকে। তবে পদোন্নতি পাওয়ার পরও বাবুল আক্তার চট্টগ্রামেই থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষমেশ তাকে ঢাকায় পুলিশ সদর দফতরে বদলি করা হয়।
বাবুল আক্তার বদলি হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় তার বিশ্বস্ত চার সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে সিএমপির গোয়েন্দা শাখা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়। এরা হচ্ছেন- এসআই সন্তোষ চাকমা, রাজীব, আফতাব আহমেদ ও রাজেশ। এ বদলির বিষয়টিকে অনেকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোমবার পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এসপি বাবুল আক্তার বহু আগে থেকেই ষড়যন্ত্রকারীদের টার্গেটে পরিণত হন। তবে তাকে দুর্বল করতে তার পরিবারের ওপর পরিকল্পিভাবে হামলা চালানো হয় বলে ধারণা ওই কর্মকর্তার। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীরা প্রচণ্ড প্রতাপশালী। এর ফলে প্রকৃত ঘটনা আদৌ তদন্তে আসবে কিনা তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা।
অপর এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকৃত সত্য জানতে হলে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এমনও হতে পারে সত্য প্রকাশিত হলে অনেকের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সে কারণে বিষয়টি নিয়ে আপাতত একটু ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর ও আর নিজাম রোডের বাসার অদূরে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। মোটরসাইকেলে আসা তিন হামলাকারী মিতুকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর থেকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, গত কয়েক বছরে চাকরিকালীন সময়ে চট্টগ্রামে জঙ্গি দমন অভিযানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন বাবুল আক্তার। আর এ কারণে জঙ্গিদেরই টার্গেটে ছিলেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা। তবে ঘটনার দু’দিন আগে বদলিজনিত কারণে ঢাকায় আসেন এসপি বাবুল আক্তার। ঘটনার দিন ৫ জুন তার নতুন কর্মস্থলে যোগ দেয়ার কথা ছিল। আর এ দিনই ঘটে যায় মর্মান্তিক এ ঘটনা।
সূত্র : যুগান্তর