জাহিদুর রহমান তারিক, ঝিনাইদহ | ১৪ জুলাই, ২০১৬
ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার সন্দেহভাজন জঙ্গী নিবরাস ইসলাম প্রায় চার মাস ঝিনাইদহ শহরে ছিলেন। পরিচয় গোপন করে সাঈদ নামে ঝিনাইদহ শহরে বাসা ভাড়া নেয় নিবরাস। এ খবর ফাঁস হওয়ার পর ঝিনাইদহের তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
এদিনে নিবরাসের অবস্থানকালে ঝিনাইদহে বিভিন্ন সময়ে চারজন ভিন্নমতাবমলম্বী খুন হন। যা দেশব্যাপী আলোচনায় ওঠে আসে। এসব হত্যাকান্ডের সাথেও জঙ্গি নিবরাস জড়িত ছিলেন কি না এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
জানা গেছে, নিবরাস ইসলামের সাথে মোস্তফাসহ আরো ৭/৮ জন যুবক ওই ভাড়া বাড়িতে থাকতেন।
ঝিনাইদহ শহরের সোনালীপাড়া মসজিদের ইমাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোকনুজ্জামন তাদেরকে এই বাসা ভাড়া নেওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেন। নিবরাস ইসলাম ওরফে সাঈদ গত ২৮ জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার মাস ওই ভাড়া বাড়িতে ছিলেন। বাড়ির মালিক সেনাবাহিনীর সাবেক সার্জেন্ট কওছার আলী মোল্লার স্ত্রী বিলকিস নাহার এ সব তথ্য জানান। তবে তিনি নিবরাস ইসলামকে সাঈদ নামেই চিনেন।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের কাছে বিলকিস নাহার বলেন, গুলশান হামলায় সন্দেহভাজন জঙ্গী নিবরাস ইসলামই সাঈদ। আমি ছবি দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। ছবির সাথে চেহারার মিল রয়েছে।
ঝিনাইদহের এই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো নিবরাস
ঝিনাইদহ শহরের সোনালীপাড়ার বাসিন্দা স্থানীয় সরকারী কেসি বিশ্ববিদালয় কলেজের ছাত্র নওর জামিল বর্ষন জানান, সাঈদ তাদের পাড়ায় চার মাসের বেশি সময় ভাড়া ছিল। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যলয়ে ভর্তি হবেন বলে তাদের কাছে জানান।
এ সময় সাঈদ তাদের সাথে ফুটবল খেলতেন। তিনি অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারতেন। এ জন্য সবাই তাকে পচ্ছন্দ করতেন।
বর্ষন আরো জানান, ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার সাথে জড়িত সন্দেহভাজন জঙ্গিদের ছবি প্রকাশের পর আমরা তাজ্জব হয়ে যাই। তাদের সাথে খেলা করা সেই সাঈদই নিবরাস ইসলাম বলে তারা ছবি দেখে জানতে পারেন।
এদিকে জঙ্গী নিবরাস ইসলামকে সহায়তার দায়ে ঝিনাইদহ থেকে ৫ জনকে আটক করেছে ঢাকা থেকে আগত আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ টিম। আটকৃতরা হলেন, ঝিনাইদহ শহরের সোনালী পাড়ার ঠান্ডু মোল্লার ছেলে কাওছার আলী মোল্লা, তার দুই ছেলে ঝিনাইদহ কলেজের ছাত্র বিনছার আলী, নারিকেলবাড়িয়া কলেজের ছাত্র বেনজির আলী, হামদহ সোনীপাড়া মসজিদের ইমাম যশোরের ঝিকরগাছার নায়রা গ্রামের রোকনুজ্জামান ও শারশিনা মাদ্রাসার ছাত্র আদর্শপাড়া কচাতলার মাদ্রাসা শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের কিশোর ছেলে হাফেজ আব্দুর রব।
গত ৬ জুলাই সন্ধ্যার সময় এদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন বিসকিস নাহার। তিনি আরো দাবি করেন ঈদের দিন (৭ জুলাই) তাকেও ঝিনাইদহ র্যাব ক্যাম্পে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগের দিন সন্ধ্যায় (৬ জুলাই) র্যাবসহ একটি বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা তার স্বামী, দুই ছেলে, মসজিদের ইমাম ও তারাবির নামাজের হাফেজকে নিয়ে যায়।
বুধবার বিকাল থেকে একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলে ঝিনাইদহ থেকে ৫ সন্দেহভাজন জঙ্গি আটকের খবর প্রচার করে।
এ নিয়ে ঝিনাইদহ সাংবাদিকদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। নিবরাস ইসলাম ঝিনাইদহ থাকা অবস্থায় জেলায় কিছু আলোচিত হত্যা সংঘটিত হয়। এই হত্যার তালিকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই পুরোহিতসহ রয়েছেন খ্রিষ্টান হোমিও চিকিৎসক ও শিয়া মতবাদের এক ব্যক্তি।
এই চার হত্যাকান্ডের বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রচার করে। যা গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার সাথে মিল রয়েছে।
গত ৭ জুন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার করোতিপাড়া গ্রামের আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলী খুন হন। নিহত আনন্দ গোপালের বাড়ি ও নিবরাস ইসলাম ওরফে সাঈদ যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সেই বাসার মালিক কওছার আলী মোল্লার বাড়ি একই গ্রাম বাগডাঙ্গা করোতিপাড়ায়।
এর আগে গত ৭ জানুয়ারী ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালুহাটী গ্রামের বেলেখাল বাজারে খ্রীষ্টান হোমিও চিকিৎসক সমির বিশ্বাস ওরফে সমির খাজা ও ১৪ মার্চ কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা এলাকার শিয়া মতবাদের হোমিও চিকিৎসক আব্দুর রাজ্জাককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
সর্বশেষ গত ১ জুলাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার উত্তর কাস্টসাগরা গ্রামে এবার স্থানীয় রাধামদন মঠের সেবায়েত শ্যামানন্দ দাসকে (৬২) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার শেখ জানান, এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তিনি বলেন, এদেরকে আটক করেছে, কেন করেছে বলতে পারছি না।
ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে চিহ্নিত হামলাকারী নিবরাজ ইসলামের লাশ উদ্ধারের পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে এই তরুণ গত ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন।