সিলেটটুডে ডেস্ক | ২২ জুলাই, ২০১৬
একটি শব্দই বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছিল ১০০ কোটি ডলার চুরি থেকে। জুপিটার, এ শব্দ দেখেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক সাইবার অপরাধীদের ১০০ কোটি ডলার স্থানান্তরের চেষ্টা প্রতিহত করেছিল। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এমন একজনকে উদ্ধৃত করে গতকাল (বৃহস্পতিবার) এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিউইয়র্ক ফেডের বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব থেকে ১০০ কোটি ডলার চুরির চেষ্টা করে অপরাধীরা। এর মধ্যে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার ফেড থেকে ছাড় করতেও সমর্থ হয় তারা। তবে বাংলাদেশের এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বহুগুণ হতে পারত। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি শব্দই বলা যায় বাঁচিয়ে দেয় বাংলাদেশকে। ওই শব্দটি হচ্ছে ‘জুপিটার’। এ শব্দ দেখেই কিছুক্ষণের মধ্যে ফেড কর্মকর্তারা অপরাধীদের পাঠানো অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশনাগুলো স্থগিত করেন।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অপরাধীরা ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) যে শাখায় অর্থ স্থানান্তরের জন্য অনুরোধ পাঠায়, তার ঠিকানায় ছিল জুপিটার শব্দটি।
এদিকে ঘটনাক্রমে জুপিটার নামের একটি ইরানি অয়েল ট্যাংকার ও শিপিং কোম্পানিও রয়েছে, যার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা ছিল নিউইয়র্ক ফেডের কাছে। আর এ তালিকায় জুপিটার নামের প্রতিষ্ঠান থাকার কারণেই তাত্ক্ষণিকভাবে অর্থ স্থানান্তর স্থগিত করে নিউইয়র্ক ফেড।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এমন ব্যক্তি জানিয়েছেন, অপরাধীদের পাঠানো লেনদেন নির্দেশনা অনুযায়ী ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার নিউইয়র্ক ফেডের ছাড় না করার বিষয়টি পুরোপুরি ‘কাকতাল’ ছিল। এ চুরির সঙ্গে ওই কোম্পানির কোনো সম্পর্ক রয়েছে এমন কোনো তথ্যই নেই।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, অপরাধীদের পাঠানো লেনদেন নির্দেশনাগুলো অনেক দিক থেকে সাধারণের চেয়ে আলাদা ছিল। ওইসব নির্দেশনা প্রথমে ভুল ফরম্যাটে কিছু ব্যক্তিকে প্রদানের জন্য পাঠানো হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো বিভিন্ন নির্দেশনা থেকেও এগুলো আলাদা ছিল।
তবে এর কোনোকিছুই নিউইয়র্ক ফেডকে লেনদেন স্থগিতে উদ্বুদ্ধ করেনি। শুধু ওই একটি শব্দই প্রতিষ্ঠানটিতে সবচেয়ে বড় সতর্কতা বার্তা হয়ে আসে। তবে তা সত্ত্বেও নিউইয়র্ক ফেড ওই সতর্কতা বার্তাতেও সাড়া দিয়েছে তুলনামূলক ধীরগতিতে। আর এ বিলম্বিত সাড়ার সুযোগেই অপরাধীরা ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নিতে সমর্থ হয়। এর মধ্যে মাত্র ২ কোটি ডলার শ্রীলংকা থেকে ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ। আর ফিলিপাইনের বিভিন্ন ব্যক্তির নামে পাঠানো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের অধিকাংশই এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
রয়টার্স অপরাধীদের পাঠানো বিভিন্ন লেনদেন নির্দেশনা, এ সম্পর্কিত ই-মেইল ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করেছে। পাশাপাশি তারা তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তি, আইনজীবী এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেছে। এতে এ পুরো ঘটনায় জড়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও অদক্ষতার পরিচয় সুস্পষ্ট বলে মনে করেছে রয়টার্স।
বার্তা সংস্থাটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হচ্ছে, পুরো ঘটনায় নিউইয়র্ক ফেড অনেকটা নিষ্পৃহ ভূমিকা নিয়েছে। ওইসব জাল লেনদেন নির্দেশনা স্থগিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিটটি যতটুকু পদক্ষেপ নিয়েছে, তাও ছিল গদাই লস্করি চালের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির এ ঘটনা নিউইয়র্ক ফেডের জালিয়াতি ধরার সক্ষমতার বিষয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন হাজির করেছে। যদিও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এসব পদ্ধতি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। চুরির ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের প্রতি দায় চাপাতেই আগ্রহী ছিল বেশি। এতে অর্থনৈতিক কূটনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি দরিদ্র দেশগুলোর সম্পদের সুরক্ষার বিষয়ে পশ্চিমা বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিকতার অভাবের বিষয়টিও এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এখন নিউইয়র্ক ফেডের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বলেও ব্যাংকটির একটি সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক লেনদেন-বিষয়ক বার্তা আদান-প্রদানের সংস্থা সুইফটের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে অভিযোগ হচ্ছে, সুইফটের গৃহীত ভুল পদক্ষেপের কারণেই অরক্ষিত হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা জানিয়েছেন, খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারে তারা নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
এদিকে নিউইয়র্ক ফেড শুরু থেকেই যেকোনো ধরনের ভুল পদক্ষেপের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। পাশাপাশি তারা নিজস্ব সিস্টেম সুরক্ষিত রয়েছে বলেও দাবি করে আসছে। এ বিষয়ে রয়টার্সের করা বিভিন্ন প্রশ্নের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) চলমান তদন্তকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে।
একইভাবে সুইফটও কোনো ধরনের দায় নিতে অস্বীকার করেছে। সংস্থাটির মুখপাত্র বলেন, আমরা (বাংলাদেশ) ব্যাংকটিকে এবং চলমান তদন্তে সহায়তা করছি। আমরা নিরাপত্তা বিষয়ে সামনে তাকাতে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসওম্যান ক্যারোলিন ম্যালোনি বলেন, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, সুইফট সিস্টেম ও ফেডারেল রিজার্ভের সিস্টেমের মধ্য দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরি হতে পারে। ত্রুটি সংশোধনের জন্য এটি একটি সতর্কতা বার্তা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদ্ধতির ওপর মানুষের আস্থায়ও এটি একটি প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
তিনি ছাড়কৃত পাঁচটি নির্দেশনার বিষয়ে নিউইয়র্ক ফেডকে জবাবদিহি করেন। ম্যালোনি বলেন, বাকিগুলোর (মোট ৩৫টি নির্দেশনা পাঠিয়েছিল অপরাধীরা) সঙ্গে এ পাঁচটির কী পার্থক্য ছিল? কী কারণে এগুলো ছাড় করা হলো?
গত ১০ মে সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেলে বাংলাদেশ ব্যাংক, নিউইয়র্ক ফেড ও সুইফটের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসেন। আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর ফজলে কবির, নিউইয়র্ক ফেডের প্রধান উইলিয়াম ডাডলি উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, তিনটি পক্ষই অর্থ উদ্ধারে একযোগে কাজ করতে সম্মত হযেছে। তবে ওই আলোচনা সম্পর্কে জানেন এমন একজনকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, নিউইয়র্ক ফেড বাংলাদেশ ব্যাংকের আচরণে হতাশ হয়েছে।
ব্যাংকটি নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে তাদের সাইবার নিরাপত্তা-বিষয়ক তথ্য বিনিময়ে রাজি হয়নি। একই সঙ্গে ব্যাংকটি শুধু এ অভিযোগই তুলেছে যে, ফেডের কোনোভাবেই জাল ওইসব লেনদেন নির্দেশনা ছাড় করা উচিত হয়নি। এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠক চলতি মাসের শুরুতে হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা পিছিয়ে দেয়া হয়। তবে পরিবর্তিত তারিখ সম্পর্কে দুই পক্ষের কেউই কিছু জানায়নি। পরবর্তী এ বৈঠকটি নিউইয়র্ক ফেডের ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান কার্যালয়ে হওয়ার কথা রয়েছে।