Sylhet Today 24 PRINT

জিয়া ছিল এন্টায়ার নাটকের মূল নায়ক : একান্ত সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী

দ্বোহা চৌধুরী  |  ১৫ আগস্ট, ২০১৬

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমণ্ডির একটি সিঁড়িতে মুখ থুবড়ে পড়ে পথ হারিয়েছিলো বাংলাদেশ। জাতির সবচেয়ে নির্মম এই দিনে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ছিলেন প্রবাসে। প্রবাসে থাকাকালীন সেদিনকার তাঁর অভিজ্ঞতার একান্ত  সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন সাংবাদিক দ্বোহা চৌধুরীকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার নীল নকশাকারীদের ব্যাপারে কথা বলছেন অকপটে। সাক্ষাতকারটি ২০১৫ সালের ১৪ আগস্ট অর্থমন্ত্রীর সিলেটের বাসায় গ্রহণ করা হয়।

দ্বোহা চৌধুরী: ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়, সেই সময় আপনি কোথায় ছিলেন? খবরটা কিভাবে জানলেন আর সেই মুহূর্তে আপনার অনুভূতি কি হয়েছিল?

অর্থমন্ত্রী: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে আমি একটু অসুস্থ ছিলাম, খুব বেশি না, সামান্য। আমি ম্যানিলায় ছিলাম। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে। আমি অসুস্থ থাকায় সেদিন সকালবেলায় অফিসে যাই নাই। আর আমার অফিসও জানে, ডিউটিতে আমি আসবো না।

১১টা-১২টার দিকে আমাদের ইনফর্মেশন ডিভিশনের ডা. হরিহরণ বলে এক ভদ্রলোক ছিলেন, ভারতীয়, তিনি আমাকে টেলিফোন করলেন বাসায়। বললেন যে, ‘আমরা একটা আনকনফার্মড নিউজ পেয়েছি, বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, এবং বঙ্গবন্ধুর উপর আক্রমণ হয়েছে। তিনি আহত না জীবিত তা এখনো আমরা জানিনা।’ আমি বললাম, বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান! আর্মিই নাই, এই পনেরো-বিশ হাজার সৈন্য আছে। উনি বললেন, ‘না একটা সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে।' তো আমার জ্বর তখন পালায়া গেলো। আমার আর কোন অসুখ থাকলো না।

আমি তখনই ফোন করলাম, প্রেস ফাউন্ডেশন অব এশিয়া, যার হেডকোয়ার্টার তখন ম্যানিলায় ছিল। সেইখানে অমিতাভ চৌধুরী নামে একজন বাঙালি ছিলেন এর প্রধান, উনার আমার সঙ্গে বেশ ভাল ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল, আমি উনাকে টেলিফোন করলাম। উনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা খবর জানি, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তবে ডিটেইলস পাই নাই। আমাদের একজন কর্মী ওখানে ছিল, নাসের, নাসেরকে আমি এসাইন করেছি, সমস্ত খবর, যে রেডিও আছে, সেগুলো মনিটর করছে, যাতে খবর পাওয়া যায়।’ আমি তখন নাসেরকে ফোন করলাম। ততক্ষনে আমি কনফার্ম, কিন্তু তখনো তারা বলছে আর্মি অভ্যুত্থান। তখনো কেউ বলেনি, কয়েকজন আর্মি। বলছে মিলিটারি আপরাইজ হয়েছে এবং তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে।

এই পর্যন্ত শুনে আমি আমার অফিসে গিয়ে বসলাম, তখন ম্যানিলায় বাঙালি কম ছিল, তারা প্রায় সবাই চলে আসতেন আমার এখানে, তখন আট দশ মানুষ ছিল বাঙালি, বেশি না, তারা সবাই আমার অফিসে চলে আসে। তো সবাই আমরা ওখানেই থাকছি আর অপেক্ষা করছি আর কি খবর পাওয়া যায়? তো পরে পুরো খবরই পাওয়া গেল, যে আর্মি অভ্যুত্থান হয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে এবং মোশতাক প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। এই দিনে এইটাই।

আমরা যারা ছিলাম, আমাদের সকলের কাছে যেটা খুব আশ্চর্য লাগলো যে বাংলাদেশ আর্মিতে এরকম একটা অভ্যুত্থান কি করে হলো? এক নম্বর হলো সবচেয়ে স্ট্রং আর্মি আর দুই নম্বর হলো এরা মোস্টলি ফ্রিডম ফাইটার্স। তো এরা কি করে এটা করতে পারলো। এটা একটা রহস্য থেকে গেলো।

তখন অবশ্য চিফ অব স্টাফ ছিলেন শফিউল্লাহ, ওরা তখন শফিউল্লাহকে আর্মি প্রধান থেকে অপসারণ করে জিয়াকে বসালো। এটা বেশ আশ্চর্য মনে হচ্ছিলো এবং তখনো জিয়াউর রহমানের যে ইনভল্ভমেন্ট তা কেউ জানে নাই, আমাদের মনে হয় না, প্রথম দিনে এটা যে আর্মি ক্যু না, অর্থাৎ অন্যরকম কোন খবর আমরা পাই নাই।

সেদিন সন্ধ্যার পরে আমাদের এখানে যে মহিলারা ছিলেন সবাই আমাদের বাসায় আসলেন, এবং কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি যে- বঙ্গবন্ধু নাই, তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশে হত্যা করা হয়েছে। ইট ওয়াজ এ ট্রেজিডি।
পাকিস্তানে তাকে হত্যা করার কত চেষ্টা হলো, কিছুই হয় নাই। আর নিজের দেশে এসে এইভাবে জান যাবে এইটা আমরা কেউ বিশ্বাসই করতে পারি নাই। এই হলো ১৫ আগস্টের আমার স্মৃতি।

দ্বোহা চৌধুরী: এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে কোন ধরণের তীব্র আন্দোলন বা কোন কিছু...

অর্থমন্ত্রী: আমার নিজের মনেও এটা সবসময় আসে, কেনো ১৫ তারিখে ঢাকায় কোন বড় ধরণের প্রতিবাদ হলো না। এইটার কোন এক্সপ্লেনেশন কেউ দিতে পারবে না। আমার কাছে মনে হয়, এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্রাজেডি। ঢাকায় এইটার একটা স্বতস্ফুর্ত প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। এটা হয় নাই।

দ্বোহা চৌধুরী: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক যে যোগসূত্রতা পাওয়া যায় তা সম্পর্কে আপনার ধারণা কি? তাছাড়া দেশে এ হত্যায় জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার ব্যাপারটা কিরকম?

অর্থমন্ত্রী: এটা তো অত্যন্ত পরিস্কার যে, পাকিস্তান এর পেছনে আছে। কারণ খবরটা প্রথম পাকিস্তান থেকেই প্রচারিত হয়। লিবিয়ার সম্পর্কটা তখন জানা যায় নি। আমি এসিউম করেছি এটা পাকিস্তান করেছে, দেশের এরা পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে করেছে। এটা আলটিমেটলি প্রুভেন যে, এরা পাকিস্তানের এজেন্ট এবং লিবিয়ার পয়সা। জিয়াউর রহমান ওয়াজ ভেরি ক্লেভার। সে বেশ কিছুদিন কেপ্ট হিমসেল্ফ ইনোসেন্ট। যেন সে এসবের মধ্যে নাই। কিন্তু সে ছিল আসল ষড়যন্ত্রকারী এবং সে ছিল এই এন্টায়ার নাটকের মূল নায়ক। সেই এই এন্টায়ার অপারেশন রাইট করেছে।

দ্বোহা চৌধুরী: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যে পট পরিবর্তনটা এসেছিল, তার কারণে কি কি ক্ষতি হয়েছিল, আমাদের ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে?

অর্থমন্ত্রী: আমরা যদি অর্থনীতির কথা বলি, তাহলে দেশের স্বাধীনতার পরের প্রথম তিন বছর ছিল শ্রেষ্ঠ। বাংলাদেশের এই তিন বছরের এভারেজ গ্রোথ রেট ছিল এট এভারেজ ৭ পার্সেন্ট। এই মিলিটারি টেকওভারের পরের পনেরো বছর এটা ৩ থেকে ৪ পার্সেন্টে স্থির ছিল, যা স্বাভাবিক। একটা জনসমর্থনহীন সরকার, কোন দেশের উন্নয়ন কখনো করতে পারে না। এবং তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাংলাদেশ।

খালেদা এসে ৫ বছর রাজত্ব করলো, একটু চেঞ্জ হলো, কিন্তু এটা মোর অর লেস ওই আর্মি রাজত্বই চললো। যে রকম আগের রাজত্ব ছিল, ৯৬ সাল পর্যন্ত, এটা প্রায় এক রকমই রইলো, মানে টানা ২১ বছরই একরকম সামরিক শাসন এবং এই ২১ বছর বাংলাদেশের ইতিহাসের সবথেকে খারাপ সময়।

যে মুহূর্তে তারা বিদায় নিলো, সেই মুহূর্ত থেকে আমাদের উন্নয়ন শুরু হলো। এটা গণতন্ত্রের একটা অত্যন্ত ভাল উদাহরণ।

গণতন্ত্রে যতই অদক্ষতা থাকুক, যতই নিজেদের মধ্যে মারামারি হোক, গণতন্ত্রে মানুষের স্বার্থ রক্ষা হয়। বিশ্বে বাংলাদেশ এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

[সাক্ষাতকারটি প্রতিদিনের সিলেট অনলাইনে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকম পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহীতার সম্মতিক্রমে সাক্ষাৎকারটি আবারো প্রকাশিত হলো।]

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.