রাইআন কাব্য | ০৫ জানুয়ারী, ২০১৫
টানা দুই দিন গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকার পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নয়াপল্টন সমাবেশে যোগ দিতে গাড়িতে চড়ে বসেছিলেন কিন্তু গাড়িতে ওঠে ফটক পেরুতে না পেরে সাংবাদিকদের সাথে ব্রিফিংকালে আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি হিসেবে অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা করেন। এরপর তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
অবরোধ ত বিএনপি ঘোষণা করেনি তাহলে অব্যাহত থাকবে কীভাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অবরোধ চলবে বলে ফের জানান। এদিকে বেগম জিয়া অবরোধের প্রকারভেদ নিয়ে পরিষ্কার কিছু না বললেও তা পরিষ্কার করেছেন রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ। তিনি জানান- রেল, নৌ ও সড়কপথে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হবে। ফলে ‘সরকারি অবরোধ’র পর ‘বেসরকারি অবরোধ’র কবলে পড়ল বাংলাদেশ।
এদিকে গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় এখনও ঘিরে রেখেছে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী। কবে নাগাদ এই ‘নিরাপত্তা’ ব্যবস্থা ওঠিয়ে নেওয়া হবে সে সম্পর্কে কারো পরিষ্কার ধারণা না থাকলেও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি আসাদুজ্জামান খান কামালের বক্তব্য অনুযায়ি খালেদা জিয়ার এই অবরুদ্ধ অবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে। কামাল জানান- বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার দিকটি সরকারের কাছে প্রায়োরিটি তাই তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের মন্ত্রিদের কাছে খালেদা জিয়ার বাড়ি ও গুলশান কার্যালয় ঘিরে অতিরিক্ত পুলিশি নিরাপত্তাকে দেশের মানুষ খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি হিসেবেই দেখছেন এবং সহসা যে এই পরিস্থিতিতে থেকে উত্তরণ ঘটছে না সেটাই মনে করছে। টানা অবরোধের শেষ পর্যায়ে এসে এই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
কবে শেষ হতে পারে অবরোধ? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই। তবে এই অবরোধ কর্মসূচি দীর্ঘায়িত না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কারণ ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তুরাগ তীরে আগামি ৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্যায়।
বিশ্ব ইজতেমাকে উপমহাদেশের মুসলিম সম্প্রদায় পবিত্র হজ্বের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম মিলনমেলা হিসেবেই মনে করে থাকে। তিন দিনব্যাপি বিশ্ব ইজতেমায় সারা দেশের মুসল্লিদের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশসমূহ থেকে মানুষজন জমায়েত হয়ে থাকে।
বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে সারা দেশের মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা ছাড়া বিএনপির সামনে এই মুহুর্তে আর কোন পথ খোলা নেই। সে হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসনের টানা অবরোধের ব্যাপ্তি হতে পারে বড়জোর দুই দিন। এবং বিশ্ব ইজতেমা শেষে অন্তত দুই দিন দেশকে অবরোধের বাইরে রাখা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই। ফলে টাটকা আন্দোলন থেকে তারা সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে খুব সহজেই মাঠছাড়া হতে যাচ্ছে বিএনপিসহ বিশ দলীয় জোট।
এদিকে ৫ জানুয়ারির পুরো দিন দেশব্যাপি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর অপ্রত্যক্ষ সহায়তায় রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো আওয়ামিলীগের বিপরিতে বিএনপির অবস্থা ছিল চরম নাজুক। তারা মাঠে দাঁড়াতেই পারেনি সরকারি দল আওয়ামিলীগ ও তাদের অঙ্গসহযোগি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে। তার ওপর ছিল পুলিশি একশন। ফলে অনেক জায়গায় বিএনপি দলীয় নেতাকর্মি আহত-নিহত হয়েছে, ক্ষতিসাধিত হয়ে প্রভূত জানমালের।
‘গণতন্ত্র হত্যা ও কালো দিবস’ উপলক্ষে বিএনপির কেন্দ্রিয় নেতারা আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। শুধুমাত্র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপি সমর্থিত পেশাজীবিদের আলোচনা সভায় অংশ নিয়েছিলেন। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি দূর্বল আন্দোলনের জন্যে প্রথমে দলীয় নেতাকর্মির রোষানলে পড়ার পর পরই সরকারদলীয় অঙ্গসহযোগিদের ধাওয়ার কবলে পড়েন। মির্জা ফখরুলের বাইরে আর কোন নেতাকে রাজপথে ত দূরের কথা কোথাও দেখা যায় নি। এমনকি ঢাকা মহানগর বিএনপির মির্জা আব্বাস-সোহেলদেরও মাঠে দেখা যায়নি। উপরন্তু তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অথচ নতুন ঘোষিত এই কমিটি নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনা ছিল ঢাকার মাঠ দখলের।
ঢাকা মহানগরীর ২০০টি পয়েন্ট ঘোষণা দিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে সরকারি দল আওয়ামিলীগ ও তাদের অঙ্গসহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মিরা। সভা-সমাবেশের ওপর পুলিশি নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে তারা কোন মিছিল-মিটিং করেনি কিন্তু ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছে প্রকাশ্যে। এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও সরকারি দল এই অজুহাতে তারা কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
হাইকোর্টের বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবিরা মিছিল করেছে হাইকোর্টের অভ্যন্তরে কিন্তু বাইরে বেরুতে চেষ্টা করে সমর্থ হয়নি। পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে একজন পুলিশ সদস্যের মাথা ফেটে যায়। একই মিছিল থেকে হাইকোর্টের বিচারপতি ফরিদ আহমেদের গাড়িতে ভাংচুর চালায় বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবিরা। এতে বাঁধা দিতে গেলে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
পুরো দিন কার্যত অবরুদ্ধ ছিল ঢাকা মহানগরী। গণপরিবহনের আকালে নাকাল ছিল ঢাকাবাসী। বিএনপির কেন্দ্রিয় কার্যালয় ছিল তালাবদ্ধ, যে কোন পর্যায়ের কোন নেতাকর্মি নয়াপল্টনের বিএনপি কার্যালয়ে যাওয়ার সাহস করতে পারেননি। বিজয়নগর মোড়ে বিএনপি নেতাকর্মিরা মিছিল করতে চাইলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ফকিরাপুল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরিত হয়, কেন্দ্রিয় কার্যালয়ের সামনে দুইটি মোটর সাইকেল পুড়িয়ে দেয় বিএনপির নেতাকর্মিরা। এর বাইরে পুরো ঢাকা শহরে আচমকা মিছিল ও বোমাবাজি করেছে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতাকর্মিরা। ফলে জায়গায়-জায়গায় আওয়ামিলীগ ও পুলিশের সাথে বেধেছে সংঘর্ষ।
৫ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ের ফটক পেরুতে না পারলেও অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রেক্ষিতে আবারও চেষ্টা করবেন বাইরে যেতে কিন্তু সরকার তাঁকে সে সুযোগ দেবে বলে মনে হয় না।
গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপনে বিএনপি কেন্দ্রিয় নেতারা, জামায়াতের ঢাকাভিত্তিক করুণ সাংগঠনিক অবস্থা আর বিশ্ব ইজতেমাকে সামনে রেখে বিএনপির সরকারবিরোধি চলমান আন্দোলন শুরুর সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবে বলে অনেকেই মনে করছেন। এ পরিস্থিতিতে বিএনপিসহ বিশ দলীয় জোট কী পারবে সরকারবিরোধী আন্দোলন বেগবান করতে সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।