নিউজ ডেস্ক | ৩০ মার্চ, ২০১৫
২০১৩ সালে রাজাকার কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর প্রথম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের একটি সংগঠন ‘হিট লিস্ট’ নামে ৮৪ জন ব্লগারসহ আন্দোলনকারীদের তালিকা প্রকাশ করে। গত দুই বছরে সে তালিকার ৮জনকে খুন করেছে জঙ্গি সন্ত্রাসীরা। তালিকা অনুযায়ি এখন বাকি ৭৬!
তালিকায় ৮৪ জনের নাম প্রকাশ করে বলা হয়েছিল ‘এরা সবাই ইসলামের দুশমন’। ব্লগার এবং আন্দোলনকারীদের নাস্তিক উপাধি দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে ইসলাম ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কে কটূক্তি করে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী একে একে ব্লগারদের হত্যা করা হবে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হুমকিও প্রদান করা হয়।
সোমবার (৩০ মার্চ) নিজের কর্মস্থলে যাওয়ার পথে জঙ্গি সন্ত্রাসীদের চাপাতির আঘাতে খুন হন ব্লগার ওয়াশিকুর বাবু। দুই শিখণ্ডী তথা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সহায়তায় জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলাম নামের দুই খুনি আটক হলেও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অপর খুনি তাহের পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে খুনিরা জানায়- ‘ব্লগ কি বুঝি না, আর তার লেখাও আমরা দেখিনি। হুজুরের পরামর্শ, সে ইসলামবিরোধী। তাকে হত্যা করা ঈমানি দায়িত্ব। আর সেই ঈমানি দায়িত্ব পালন করতে ওয়াশিকুরকে হত্যা করেছি’।
ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যার সঙ্গে জড়িত দুই মাদ্রাসার ছাত্র জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলাম আটকের পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
তারা জানায়, মাসুম নামের এক বড় ভাইয়ের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। হত্যার পর তাহের নামের একজন পালিয়ে গেলেও তারা দুজন ধরা পড়ে।
পুলিশ মনে করছে, পালিয়ে যাওয়া তাহের ও বাবুর ছবি দেখিয়ে দেওয়া মাসুমকে ধরতে পারলেই হত্যার নির্দেশদাতাদের খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।
সোমবার বিকেলে তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার তাদের এই স্বীকারোক্তির কথা জানান।
তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই দুই ছাত্র বলেছে, ‘আমরা আগে ব্লগার বাবুকে চিনতাম না। রোববার বিকেলে মাসুম নামের এক বড় ভাই হাতিরঝিলে বসে ব্লগার বাবুর ছবি দেখিয়ে আমাদের বলে, সে আল্লাহ এবং রাসুলের বিরুদ্ধে কথা বলে। তাই তাকে মেরে ফেলতে হবে।
তার নির্দেশমতো আমরা আজ তাকে কুপিয়ে হত্যা করি। আমাদের সঙ্গে তাহের নামে আরেকজন ছিল। বাবুকে কোপানোর পর জনতা ধাওয়া করলে সে পালিয়ে যায়।’
উপকমিশনার বলেন, ‘জিকরুল্লা চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে শনিবার রাতে ঢাকায় আসে। ঢাকায় আসার পর সে যাত্রাবাড়ীর একটি মসজিদে রাত কাটায়। রোববার সারা দিন পরিকল্পনা করে এবং বিকেলে হাতিরঝিলে আসে। সেখানে মিরপুর দারুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্র আরিফুল্লাহ, তাহের ও মাসুম উপস্থিত ছিল।
গতকাল বিকেলেই বাবুর বাসা দেখে আসে সবাই মিলে। এরপর আজ (সোমবার) সকালে বাবু বাসা থেকে বের হলে তার ওপর চাপাতি নিয়ে হামলে পড়ে।’
উপকমিশনার আরো বলেন, ‘ধর্মান্ধরা যে বাবুকে হত্যা করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তারা কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া হত্যাকারীরা এর আগে ব্লগার হত্যার সঙ্গে জড়িত কি না, তা রিমান্ডের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হবে।’
উল্লেখ্য, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু তার দক্ষিণ বেগুনবাড়ীর বাসা থেকে কর্মস্থল মতিঝিল ফারইস্ট ট্রাভেল এজেন্সি অফিসে যাওয়ার জন্য বের হন। এর কিছুক্ষণ পরেই রাস্তায় তিনজন তাকে চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে আহত করে। এ সময় আশপাশের লোকজন ও টহলরত পুলিশ দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করে দুজনকে আটক করে। আর একজন পালিয়ে যায়।
পরে স্থানীয়রা বাবুকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।