সিলেটটুডে ডেস্ক | ০২ এপ্রিল, ২০১৫
ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিষ্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে নৃশংসভাবে খুন করে পালিয়ে যাবার সময় আটক হওয়া আরিফুল ইসলাম ও জিকিরুল্লাহ জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দাদের জানিয়েছে, তারা অভিজিৎ রায়ের হত্যাকারীদেরও চেনে,প্রথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমনটাই দাবি গোয়েন্দা সংস্থার। তারা আরও জানায় প্রায় সবগুলো জঙ্গি সংগঠন এখন যুক্ত আছে একটি কমন নেটওয়ার্কে। আর সেটা পরিচালিত হচ্ছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অধিনেই। সুতরাং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমই মূলত সব জঙ্গি সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্লার্টফর্ম হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
আর এই প্লাটফর্ম থেকেই ঘটানো হচ্ছে নৃশংস সব হত্যাকাণ্ড। তাঁদের প্রাথমিক টার্গেট মুক্তচিন্তার মানুষ , এদেরকে তারা 'নাস্তিক' ও 'মুরতাদ' আখ্যা দিয়ে বিশেষ কায়দায় হত্যার মিশন নেয়। তাদের এই হত্যার সর্বশেষ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু। ঘাতকরা জানিয়েছে মিশন চলাকালীন সময়ে তারা পরিচয় গোপন রাখার জন্য একাধিক কোড নাম ব্যবহার করে থাকে। জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদের কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হলেও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও হিযবুত তাহরির এসব নৃশংস পরিকল্পনার রোডম্যাপ তৈরি করে দেয় বলেও জানা গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে তাদের সঙ্গে হুজি, জেএমবি, হিযবুত তাহরীর ছাড়াও খতমে নবুয়ত আন্দোলন, জামিউতুল ফালাহ, ইসলামিক সলিডারিটি ফ্রন্ট, আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, আরাকান পিপলস আর্মি, আরাকান মুজাহিদ পার্টি, মিয়ানমার লিবারেশন ফোর্স, রোহিঙ্গা লিবারেশন ফোর্স, রোহিঙ্গা ইনডিপেন্ডেন্স পার্টি, রোহিঙ্গা প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট, কাতেল বাহিনী, মুজাহিদিন-ই-তাজিম, এশার বাহিনী, আল ফাহাদ, হরকাতুল মুজাহিদিন ও জাদিদ আল কায়দাসহ মাদরাসাভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে।
এসব জঙ্গি সংগঠনের উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা আনসারুল্লাহর নাম নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। পাহাড়ি ও নির্জন এলাকায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আটক আরিফুল ইসলাম ও জিকিরুল্লাহকেও ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যাকাণ্ডের আগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিশেষ করে চাপাতি কিভাবে চালাতে হয় ও কোন স্থানে আঘাত করলে দ্রুত মৃত্যু ঘটবে, সে বিষয়টিও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয় তাদের।
গোয়েন্দারা বলেন, শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ চলাকালে ব্লগারদের ভূমিকা নিয়ে বৈঠক করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আধ্যাত্মিক নেতা আটক জসিমসহ সংগঠনটির প্রথম সারির কয়েকজন নেতা। ব্লগারদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে আনসারুল্লাহর ৪ ধারার (দাওয়া, ইদাদ, রিবাত ও কিতাল) সবশেষ ধারা (কিতাল) অনুযায়ী তাদের হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
সেই সিদ্ধান্তের সময় তারা একটি হিটলিস্ট তৈরি করে। সেই হিটলিস্ট ধরেই স্লিপার সেল গঠন করে এর মাধ্যমে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে তারা। তবে প্রত্যেকটি হত্যার জন্য আলাদা স্লিপার সেল ব্যবহার করেছে জঙ্গি সংগঠনটি। ওই স্লিপার সেলের খোঁজে গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক টিম অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এই স্লিপার সেল প্রথমে ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যা করে। এরপর আরেক ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকেও হত্যার উদ্দেশে তারা আক্রমণ করে। কিন্তু তিনি প্রাণে রক্ষা পান। তারপর মিরপুরে একজন এবং বুয়েটের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপকেও হত্যা করে তারা।
ব্লগার রাজীব হত্যা ও আসিফ মহিউদ্দীনকে হত্যাচেষ্টায় জড়িত স্লিপার সেলের কয়েকজন সদস্য ধরাও পড়ে। এছাড়া, ইসলামের শত্রু আখ্যা দিয়ে রাজধানীর গোপীবাগে ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ লুৎফর রহমানসহ একসঙ্গে ছয় জনকে হত্যা করে এই স্লিপার সেল। হত্যা করে চ্যানেল আইয়ের ইসলামী অনুষ্ঠান উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীকে।
এরপরই হত্যা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিউল ইসলাম বাবুকে। সবশেষ অভিজিৎ রায় ও ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। তাদের আগে সাভারে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা করে জঙ্গিরা। প্রত্যেকটি ঘটনায়ই আলাদা স্লিপার সেলকে দায়িত্ব দেয় জঙ্গি সংগঠনটি।
গোয়েন্দারা মনে করছেন, দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে এই ধরনের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বর্তমানে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন তামিম আল আদনানী নামে এক জঙ্গি। সামরিক কমান্ডার হিসেবে রয়েছেন সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত পলাতক মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। আর স্লিপার সেলের সমন্বয়ক হচ্ছেন রেদোয়ানুল আজাদ রানা। প্রত্যেক স্লিপার সেলের জন্য আলাদা সমন্বয়ক রয়েছে। তবে কতোটি স্লিপার সেল রয়েছে তা জানানো যায়নি।
এসব বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, স্লিপার সেলের প্রতিটি সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওয়াশিকুর হত্যায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বড় বড় সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠনের স্লিপার সেল রয়েছে। এই সেলের সদস্যরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ। একেকটি গুপ্ত হত্যা করে আত্মগোপন করে থাকতে পারে তারা। তবে আমরা এই স্লিপার সেলের সদস্যদের খুঁজে বের করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
বাবু হত্যার ঘটনায় তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, আটকৃতরা এতটাই উগ্রবাদী যে- তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে না পারলে নিজেরা কাফের হয়ে যাবে- এমনটা মনে করে তারা। এছাড়া, এরা স্লিপার সেলে নিজেদের ছদ্মনাম ব্যবহার করে। আটক জিকিরুল্লাহর ছদ্মনাম বা সাংগঠনিক নাম মো. হোসেন, আর আরিফের নাম এরফান উল্লাহ। ছদ্মনাম ব্যবহারের ফলে তারা একে অপরকে চিনতো না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে যেন কেউ কারও নাম বলতে না পারে- এজন্য এই কৌশল।
জিকিরুল্লাহ ও আরিফের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, ব্লগার অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের খুনিদের তারা চেনে বলে জানিয়েছে। এমনকি ব্লগার রাজীব হায়দারের খুনিদেরও তারা চেনে বলে দাবি করেছে। সবগুলো খুন মতাদর্শগত কারণে বলে তারা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, তারা চেনে, জানে এবং এসব খুনের সঙ্গে জড়িত এমন কয়েকজন নাম বলেছে। সেই নামের সূত্র ধরেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত রোববার (২৯ মার্চ) সকালে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার দক্ষিণ বেগুনবাড়ী এলাকায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের জঙ্গিরা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।
এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা দুই শিখণ্ডী স্থানীয় জনতাকে সাথে নিয়ে জঙ্গিদের ধাওয়া করে জিকিরুল্লাহ ও আরিফকে চাপাতিসহ ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। এই ঘটনায় নিহত বাবুর দুলাভাই মনির হোসেন মাসুদ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ওই দুই জনের আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তাদের গোয়েন্দা কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।