Sylhet Today 24 PRINT

ব্রিকস-বিমসটেকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতাদের খুঁজে বের করতে গুরুত্বারোপ

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১৭ অক্টোবর, ২০১৬

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ব্রিকস এবং বিমসটেক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি দুই জোটের একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের মদদ এবং অর্থদাতাদের খুঁজে বের করতে নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

রোববার (১৬ অক্টোবর) ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। দুই অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা জোট ব্রিকস ও বিমসটেকের সদস্য দেশগুলোর মেলবন্ধনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই ৩ পরামর্শ হচ্ছে: (১) মানসম্পন্ন ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া (২) প্রযুক্তির জন্য বৃহত্তর সহযোগিতা কর্মসূচি চালু এবং (৩) স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে সংলাপের প্রক্রিয়া শুরু করা।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, 'বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে বাংলা‡দশ সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের যে কোন কর্মকাণ্ডে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। এই সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ দমনেও আমাদের হাত মেলাতে হবে।'

এর আগে বিমসটেক নেতাদের রিট্রিটে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (এফটিএ) গঠনের ওপর জোর দেন। এদিকে, অষ্টম ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস রুখতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শপথ নিয়েছেন সদস্য দেশগুলোর নেতারা। পাশাপাশি তারা অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করার কথাও বলেন।

আউটরিচ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সুযোগ-সুবিধার দিকে বিশেষ নজর দিতে ব্রিকস নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। মেলবন্ধনে সুনির্দিষ্ট তিন প্রস্তাব দিয়ে বলেন, সহযোগিতার জন্য পারস্পরিক সম্ভাব্যতা ও যৌথ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের এটাই সময়। শেখ হাসিনার প্রথম প্রস্তাব, উন্নতমানের অবকাঠামো

২০০১ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে গঠিত হয় 'ব্রিক'। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে এই জোট ব্রিকস হয়। ব্রিকসের আগে ১৯৯৭ সালের জুনে গঠিত হয় বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক জোট 'বিসটেক'। পরে ওই বছরই মিয়ানমার যোগ দিলে জোটের নতুন নামকরণ হয় বিমসটেক। ২০০৪ সালে নেপাল ও ভুটান এর পূর্ণ সদস্য হয়। এই দুই জোটের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের উপায় খুঁজতেই গোয়ায় অনুষ্ঠিত হয় আউটরিচ সম্মেলন।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, 'আমাদের যাবতীয় টেকসই উন্নয়নের প্রচেষ্টা নির্ভর করছে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর। সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি ব্রিকস ও বিমসটেকের নেতাদের একই টেবিলে আমন্ত্রণ জানানোয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানান।

১৯৯৭ সালে বিমসটেক গঠনের উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শেখ হাসিনা বলেন, সম্ভাবনাময় বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার মানোন্নয়নে এই ফোরাম গঠন করা হয়। এই অঞ্চল কৌশলগতভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ অঞ্চলের দেশগুলোয় উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এ অঞ্চলে রয়েছে কর্মক্ষম যুবশক্তি, যা আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর প্রয়োজন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তিনি বলেন, হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, ইলেকট্রনিক সিটির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে, সেখানে বিনিয়োগকারীরা বিপুল সম্ভাবনার সুযোগ নিতে পারেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ব্রিকস ও বিমসটেক উভয়ই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে আলাপ-আলোচনায় যুক্ত হতে পারে। বিশ্ববাজারে নিজেদের পণ্যের মান ও বাজারে যাতে তাল মেলাতে পারে, সেজন্যই এটা জরুরি। বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন।

গোয়ার হোটেল লিলায় স্থানীয় সময় বিকেল পৌনে ৪টায় রিট্রিট পর্বে অন্যান্য বিমসটেক নেতার সঙ্গে অংশ নেন শেখ হাসিনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের স্বাগত জানান। এর আগে এ জোটের নেতাদের সম্মানে গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ্মীকান্ত পারসেকারের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর নেতারা মধ্যাহ্নভোজের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থার বিরুদ্ধে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এর বিরুদ্ধে যুব সমাজ, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক পরিসরে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়েছি। আমরা এরই মধ্যে দেশেই বেড়ে ওঠা জঙ্গিদের নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছি।

অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনিও বিমসটেককে কার্যকর করার জন্য সব সদস্যের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান। অন্যান্য নেতাও তাদের বক্তব্যে বিমসটেককে কার্যকর জোটে পরিণত করার লক্ষ্যে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

এদিকে, শনিবার শুরু হওয়া দু'দিনের অষ্টম ব্রিকস সম্মেলন গতকাল শেষ হয়েছে। সম্মেলনে অংশ নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, 'বিশ্ব অর্থনীতি এখনও নাজুক অবস্থায় রয়েছে।' উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে উন্নয়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

ব্রিকস সম্মেলনে সদস্য দেশ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ছাড়াও অংশ নেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মিশেল টেমের, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহল, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচা, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি আউটরিচ সম্মেলনে অংশ নেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের ব্রিকস সম্মেলন যতটা না ছিল বাণিজ্যিক, তার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক। সেই সঙ্গে মোদী নিজেকে জাহির করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেই সামনে এনেছেন।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ‌্যে পাকিস্তান বাদে আর সবগুলো দেশের নেতারাই রোববার এক হন গোয়ায়।

এবছর পাকিস্তানে হওয়ার কথা ছিল সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। কিন্তু কাশ্মির জঙ্গি হামলা এবং পাল্টা অভিযান নিয়ে নয়া দিল্লি ও ইসলামাবাদের উত্তেজনার মধ‌্যে এই সম্মেলন পণ্ড হয়ে গেছে। তার মধ‌্যে বিমসটেক দেশগুলোর নেতাদের ব্রিকসের নেতাদের সঙ্গে এক করে মোদী ইসলামাবাদকে একঘরে করার চেষ্টা চালালেন বলে পাকিস্তানের দৈনিক ডন অভিযোগ করেছে।

সম্মেলনে মোদীও উরিতে সেনা ঘাঁটিতে হামলার পর পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে জঙ্গি ঘাঁটিতে অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ব্রিকসের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়েছেন এবং তাতে সফল হয়েছেন বলে মনে করছে ভারতের সংবাদ মাধ্যম। এই অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জন্য সন্ত্রাস একটি বড় হুমকি উল্লেখ করে পাকিস্তানকেই এজন্য দায়ী করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

“দুঃখজনকভাবে, ভারতের একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই সন্ত্রাসের জন্মদাতা,” পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য মোদীর।

পাকিস্তানের সার্ক সম্মেলন বয়কটের পেছনে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়াকে কারণ দেখানো হয়েছিল ঢাকার পক্ষ থেকে।

এর আগে, রোববার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে শেখ হাসিনা সফরসঙ্গীদের নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান মন্ত্রীপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা। ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর, গোয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী আলিনা সালদানহা, নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার সামিনা নাজ গোয়া নৌবাহিনীর বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। সেখানে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.