এমদাদুল হক তুহিন, নাসিরনগর থেকে ফিরে | ০৭ নভেম্বর, ২০১৬
নাসিরনগর থেকে শুক্রবার ঘুরে এসেছি। এরপর ঘটে গেছে আরও অনেক ঘটনা। গাড়িতে করে যখন যাচ্ছিলাম, তখনই জানতে পারি- পাঁচ ঘরে ফের আগুন দেয়া হয়েছে। ফিরে এসেছি যখন, তখনও উদ্বেগ কাটে নি। সতর্ক নজরদারির মধ্যেই বৃহস্পতিবার পাঁচটি বাড়িতে আগুন দেওয়ার পর শনিবারও হামলা হয়। ট্রলারযোগে একটি গ্রামে আক্রমণ করে উগ্রগোষ্ঠী। অবশ্য গ্রামবাসীর প্রতিরোধে হামলাকারীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তবে রাতের আঁধারে শনিবারও একটি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়।
আর রোববারের ঘটনা ভিন্ন। সমস্ত ফোকাস মন্ত্রীর দিকে। উপজেলার ডাক বাংলাতে সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়েছে আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সংবাদ সম্মেলনে তার দাবি, হিন্দুদের কটূক্তি করে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। বরং তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলে দিয়েছেন, কেউ যদি ওই বক্তব্যের প্রমাণ দিতে পারে তাহলে তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেবেন। রোববার নাসিরনগরের ইউএনকেও প্রত্যাহার করা হয়। অর্থাৎ রোববারের ঘটনায় ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে নাসিরনগর।
ব্রাম্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থেকে ফিরে এসে দুদিনের ব্যবধানেও ভুলতে পারি নি নব্বই বছরের মালা রানী সূত্রধরকে। ঢাকা থেকে ৮ জনের একটি দল গিয়েছিলাম। দলগতভাবে আমাদের যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো তাদের পাশে দাঁড়ানো। হামলার চিত্র স্বচক্ষে দেখে আক্রান্তদের সাহস যোগানো। তাদের কষ্টগুলো ভাগ করে নেওয়া। আমরা শুধু কষ্ট ভাগ করে নিয়ে আসিনি, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি মালা রানীর কান্না। আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আক্রান্তদের মূল চিত্র পূর্বাপর রিপোর্টে সেভাবে উঠে আসেনি, যেভাবে দেখেছি আমরা।
পেশাগত সাংবাদিকতার বাইরে গিয়ে যদি বলি, যে মালা রানী আমার বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন; সেই কান্না কী তুলে ধরতে পেরেছি আমি? কোন রিপোর্টে? কিংবা সহযোদ্ধা হয়ে যারা একসঙ্গে গিয়েছিলাম, তাদের বুকে যেভাবে মাথা রেখে কেঁদেছেন মালা; সেই মালা দিদির কান্নাই কি শুনাতে পেরেছি দেশবাসীকে? এমনকি পারিনি ভাত ফেলে পাতিলটি কেড়ে নেওয়ার চিত্র তুলে ধরতে। খাটের নিচে লুকিয়ে থাকা স্বামীকে মারের আঘাত থেকে বাঁচাতে কতো না চেষ্টা করেছেন শেফালী রানী সরকার। নমশূদ্র পাড়ার সজল সরকারের স্ত্রী শেফালী। গ্রামের এই নারী আমাদের সঙ্গে যাওয়া দুই বোনের বুকে পড়ে যেভাবে কেঁদেছেন; সেই কান্নার রঙ আমি চিনি না। জানি না তার ভাষা। ভাষাহীন সেই কান্না আসলে কোন শব্দেই উঠে আসে না! কোন শব্দেই উঠে আসে না সেই বোবা কান্না!
অন্তত ৫০ টি বাড়িতে ঘুরলেও আমাদের যাওয়া হয়নি রসরাজের বাড়িতে। যাওয়া হয়নি জেলে পাড়াতে। সেখানকার চিত্র নিজ চোখে দেখা হয়নি। সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে। যে ঘরে ঢুকেছি, সে ঘরের প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখন যে বেলা ফুরিয়ে গেল জানা যায়নি। শুক্রবার নামাজের পরপর নাসিরনগর সদরে নেমে রোববারের হামলার সময় প্রতিরোধ গড়া ওই এলাকার তরুণ শরিফুজ্জামান চৌধুরী সুমনের সঙ্গে দেখা। তিনিই নিয়ে গেলেন। বর্ণনা করলেন। প্রথমেই দেখেছি অনেকটা পুকুরের উপর ভাসা একটি মন্দির। খুব সম্ভবত এটি কালী মন্দির। এখানে পুকুরে এক নারী গোসল করছিলেন। তার নাম গীতা রানী সূত্রধর। তিনি বলছিলেন, বহু নারীর গয়না-পাতি নিয়ে গেছে। শো-কেসের ড্রয়ার ভেঙে লুট করা হয়েছে দামি দামি জিনিস। ওইদিন চারদিক থেকে একবারে হামলা হয়েছিলো। এলাকার কেউ হামলাকারীদের চিনতে পারেননি। আর সুমনও জানিয়েছে, হামলাকারীরা কেউ এলাকার নয়। কাউকে তারা চিনতে পারেন নি। তাহলে করা এই হামলাকারী? ভাড়াটে?
বলছিলাম- মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন হয়েছে আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। রোববার এখানেই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত নামের সংগঠনের নেতারা সমাবেশ করে। সেই সমাবেশের মাইক থেকে বলা হচ্ছিল, কেউ হিন্দু বাড়িতে হামলা করবেন না। আর একদিকে যখন এমন কথা বলা হচ্ছে, ঠিক তখনই দলে দলে বিভক্ত হয়ে প্রতিটি পাড়ায় হামলে পড়ে সমাবেশে যোগ দেওয়া ২৫ থেকে ২৬ বছরের তরুণেরা। এদের কেউ কেউ মাদ্রাসার ছাত্র। আবার কেউ ছিল লাল গেঞ্জি পরিধেয়। গৌর মন্দিরের রাস্তা ধরে একটু সামনের দিকে এগিয়ে একটি দোকানে দুপুরে নাস্তা করছিলাম। কেক-কলা খেতে খেতে এক তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি ডিগ্রীতে পড়েন। তার ভাষ্য, শুক্রবার পর্যন্ত এলাকায় তেমনভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়নি। দলে দলে এসে আক্রমণ করলে মাত্র কয়েকজনে ঠেকাবে কী করে, এমন প্রশ্নই ছুড়ে দেন তিনি। আসলেও তাই- সুমন ও জামালরা সেদিন প্রতিরোধ গড়ে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। প্রথম দফায় সফল হলেও দ্বিতীয় দফায় ব্যর্থ হয়েছেন। হামলে পড়েছিলো শত শত মানুষ। কেউ কারো কথা শুনেনি।
হামলায় আক্রান্ত কয়েকটি পরিবারের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। খুব সুন্দর ও পরিপাটি ছিল অমূল্য ও পূর্ণিমা দাসের ঘর। সংস্কৃতিমনা ও বঙ্গবন্ধুর চেতনা ধারণকারী অমূল্যের এই ঘরটিতে টিনের বেড়া ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীরা ভেঙে টুকরো টুকরো করেছে পূজোর সামগ্রী। দেয়ালে টানানো ফ্রেমে বাঁধা বঙ্গবন্ধুর ছবি মাটিতে নামিয়ে তা ভাঙা হয়েছে। শুধু ভাঙেই নি, এই ছবি পা দিয়ে মাড়িয়েছে হায়েনার দল! অমূল্যের স্ত্রী পূর্ণিমা দাস এলাকায় গান করতেন। পাড়ায় পাড়ায় তার নামডাক। গানের মাধ্যম ছিল হারমোনিয়াম। হায়েনারা সেই হারমোনিয়ামটাও ভেঙেছে। এই পরিবারের সদস্যরা শুক্রবার জোর দিয়েই বলেছেন, এটা আমার দেশ। আমরা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তা চাই। তারা অত্যাচারের ভয়ে দেশ ছেড়ে যেতে চান না। মাটির গন্ধ শুকে স্বাধীন দেশে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচতে চান।
খুবই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে সরস্বতীর সঙ্গে। মনোরঞ্জনের স্ত্রী সরস্বতী দাস মাটির কাটার কাজ করেন। দিনে ৩০০ টাকা আয় হয় তার। এর মধ্যে ১০০ টাকা নিজের খাবারে ব্যয় করেন। বাকি টাকা জমিয়ে রাখেন ছেলে সংকরের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে। সংকর দাস বর্তমানে নটরডেম কলেজে অধ্যয়নরত। ছেলে সাইন্সে পড়লেও মা এই শব্দটি উচ্চারণ করতেও জানেন না। এই গর্বিত মা জানেন- ছেলেকে বড় করতে হবে, ডাক্তার বানাতে হবে। এর জন্যে চাই টাকা। টাকার জন্যে তিনি দিনরাত কাজ করেন। শত কষ্টে তিলতিল করে জমিয়েছিলেন চার হাজার টাকা। ছেলের জন্যে মাসে দশ হাজার টাকা খরচ যোগাতে হয়। সেই টাকার জন্যে কখনও অন্যের দ্বারস্থও হতে হয় তাকে। কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে সরস্বতী বলছিলেন, বাবারে টাকা না নেওয়ার জন্য ওদের পায়ে পর্যন্ত ধরেছি। বলেছি, বাবারা আমি মাটির কাজ করি। সেই টাকা দিয়ে ছেলেকে পড়াই। এই টাকাটা নিস না। কিন্তু কে শোনে কার কথা, টাকা তো নিয়েছেই; সঙ্গে ভেঙে দিয়েছে ঘরের কিছু আসবাবও।
সেদিনের ঘটনায় শুধু টাকা পয়সা আর গহনা খোঁয়া গেছে এমন নয়। একই পরিবারের তিন ছেলে-মেয়ের গুরুত্বপূর্ণ সার্টিফিকেটও খোয়া গেছে। আবার হামলা ও লুটের ঘটনায় বিয়ে ভেঙেছে পিংকী রানীর। তার পরিবারের ভাষ্য, সিলেটের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক ছিল। ঘরে রাখা ছিল ২ লাখ টাকা ও ৮ ভরি সোনা। হামলায় পিংকীদের বাড়ি থেকে শুধু টাকা আর গহনাই লুট হয়নি, লুট হয়েছে পোল্ট্রি ফার্মের মুরগিও। ঘর ভেঙে ১৬০০ মুরগির মধ্যে ৬০০ মুরগি লুট হয়েছে। সরবরাহকারীকে বাকি মুরগি ফেরত দিয়ে ব্যবসা গুটিয়েছেন ফার্মের মালিক। পিংকীদের পরিবারটি যৌথ পরিবার। তার বাবা-চাচাকেও পেটানো হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে তার ভাই। এখন পড়ে আছে বিছানায়। তারা এতোটাই শোকাহত হয়েছেন যে, দেশ ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন! সরকারের কাছে তাদের দাবি লাল কার্ড (পাসপোর্ট) করে দেওয়ার! এতে করে সহজেই অনুমেয়, কী রকম হামলা হয়েছিল সেদিন। কী করে একটি মেয়ে বলতে পারে, ঘর থেকে বাইরে বের না হওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়েছে। এবং মেয়েটি যখন বলছিল হিন্দু বলেই আমাদের হুমকি দিয়েছে; এর পর ওই পরিবারটির সঙ্গে আর কোন কথা বলতে পারিনি।
নাসিরনগরের বেশ কয়েকটি পাড়া ঘুরে সেদিন দেখেছি, ঘর আর মন্দিরের চিত্র প্রায় একই। যে কায়দায় ঘরে হামলা হয়েছে, একই কায়দায় মন্দিরে। পানির ওপরে ভাসা কালী মন্দিরের রাস্তা চেনাও অন্য এলাকার মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য। কিংবা কাঠের সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে উঠা। অথচ হামলাকারীরা কি নির্ধিদ্বায় প্রতিমা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙেছে মাথার উপরে ঝুলানো ফ্যানটিও। গৌর মন্দিরের শুধু মূর্তিই চুরি যায়নি, এখান থেকে লুট হয়েছে রাধা মাধবের প্রতিমা এবং পিতল ও স্বর্ণের দুটি বিগ্রহ। এই মন্দিরের ক্যাশবাক্স ভেঙে টাকা লুট ছাড়াও পেটানো হয়েছে পুরোহিতকে। যিনি বর্তমানে ঢাকায় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পাশের শ্রী শ্রী শিব মন্দিরে দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা শিরলাল দাস জানান, এখানকার বিশালাকৃতির এই প্রতিমার একটি হাত ভেঙে ফেলেছে। রড দিয়ে পিটিয়ে ভাঙা হয়েছে টিনের বেড়াও।
কারা এই হামলা করেছিলো? নেপথ্যে করা? সহজেই অনুমেয় এর পেছনে জড়িত একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী। ওই এলাকায় হেফাজত শব্দটি শুনতে পেয়েছি বেশ কয়েকবার। আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নেতারা তো এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত। তারা মাইক দিয়ে বলেছেন, আমরা হিন্দুদের বাড়িতে হামলা করবো না। সঙ্গে সঙ্গেই দলে দলে বিভক্ত হয়ে শুরু হয়ে গেছে হামলা। তাহলে এখনও কেন এই সংগঠনের কোন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? হামলাকারীদের যেহেতু এলাকাবাসী চিনতে পারেননি, তাহলে নিশ্চয়ই তারা পার্শ্ববর্তী কোন গ্রাম, ইউনিয়ন বা উপজেলার? এক্ষেত্রে কারা তাদের জমায়েত করেছিল? কোন দোকানের মাইক থেকে ঘটনার আগের দিন নাসিরনগর জুড়ে মাইকিং করা হয়েছিল? কারা লিফলেট ছড়িয়েছিলো?
যতোই স্থানীয় আওয়ামী লীগে কোন দ্বন্দ্ব নেই বলে ধোঁয়া তোলা হোক, ঘটনায় প্রকাশ্যে এসেছে আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ বিরোধও। যে রসরাজ দাসের ফেসবুক আইডি থেকে ছড়ানো হয়েছে ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট, সেই রসরাজ একজন জেলে। থাকেন জেলেপাড়ায়। আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাকে বলির পাঁঠা বানিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগেরই কেউ! অথবা উগ্রবাদী গোষ্ঠী!
এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায়, উগ্রবাদী গোষ্ঠী রসরাজকেই বেছে নেবে কেন? তাহলে কী মূল ঘটনার হোতারা রসরাজের আশেপাশেরই কেউ? তবে নাসিরনগরে যে হামলা হয়েছে, তা কেবল উগ্রবাদী গোষ্ঠীরই। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কেউ বঙ্গবন্ধুর ছবিকে অবমাননা করতে পারে না। পারে না ভেঙে দিতে কোন হারমোনিয়াম।