Sylhet Today 24 PRINT

স্বীকৃতি চান গার্ড অব অনার দেওয়া সেই আনসার সদস্যরা

নিউজ ডেস্ক |  ১৭ এপ্রিল, ২০১৫

মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে ১২ জন আনসার সদস্য গার্ড অব অনার দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে চারজন এখনও জীবিত রয়েছেন। তবে প্রথম সরকার গঠনের ৪৪ বছর পার হলেও তাদের মধ্যে রয়েছে যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার অপূর্ণতা। 
  
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের নিরাপদ স্থান হিসেবে বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননকেই বেছে নেওয়া হয়। শপথ গ্রহণের পর সেই বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক মুজিবনগর।  
  
পুলিশ-ইপিআরের কেউ ভয়াবহ পরিণতি চিন্তা করে রাজি না হলেও জীবনের মায়া ত্যাগ করে শপথ অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের গার্ড অব অনার প্রদান করেন ১২ জন আনসার সদস্য। যাদের মধ্যে জীবিত চারজন আজও ইতিহাসের সেই সাক্ষ্য বহন করে বেড়াচ্ছেন।আনসার সদস্য আজিম উদ্দীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, সেদিন মা-মাটি আর মানুষের মুক্তির কথা ভেবে ১২ জন আনসার জীবনের মায়া ত্যাগ করে মন্ত্রিপরিষদকে গার্ড অব অনার প্রদানে রাজি হয়েছিলেন।  
  
তৎকালীন মেহেরপুরের পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমানের (এসপি মাহবুব) নেতৃত্বে তিনিসহ পিসি ইয়াদ আলী, সিরাজুল ইসলাম, অস্থির মল্লিক, হামিদুল ইসলাম, সাহেব আলী, লিয়াকত আলী, নজরুল ইসলাম, ফকির মোহাম্মদ, মহিউদ্দিন, কেসমত আলী, মফিজ উদ্দিন অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের গার্ড অব অনার প্রদান করেন। দেশে ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেও তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে গার্ড অব অনার প্রদান করেছিলেন। 
  
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুজিবনগরের ভবেরপাড়ার ইপিআর ক্যাম্পের সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ করতে কুষ্টিয়া চলে যান। সে সময় ওই ক্যাম্পের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পান স্থানীয় ১২ আনসার সদস্য। ভারত থেকে যেসব খাদ্য সামগ্রী ও অস্ত্র-গোলাবারুদ, জ্বালানি তেল এদেশে আসতো সেগুলো সংগ্রাম কমিটির সদস্যরা একত্রিত করতেন। পরে মেহেরপুরের তৎকালীন এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা) হাতে তুলে দিতেন আনসার সদস্যরা। পরে এসব সামগ্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সরবরাহ করা হতো।  
  
১৬ এপ্রিল সকালে তৌফিক-ই-ইলাহী ১২ আনসার সদস্যকে ডেকে বলেন, বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে কিছু মেহমান আসবেন। আপনারা আয়োজন সম্পন্ন করেন।  
  
সে অনুযায়ী গ্রামবাসীদের সহায়তায় বর্তমান মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের স্থানে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে কয়েকটি চৌকি এনে একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়। ওইদিন রাতেই ভারতীয় ফোর্স এসে সেখানে অবস্থান নেয়। পরদিন সকালে ভারতের সীমানা পেরিয়ে বৈদ্যনাথতলায় আসেন জাতীয় চার নেতাসহ স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা। সঙ্গে আসেন দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা। সেখানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা শপথ নেন এবং ১২ আনসার সদস্য তাদের গার্ড অব অনার প্রদান করেন।  
  
জীবনের মায়া ত্যাগ করে আর বুক ভরা আশা নিয়ে গার্ড অব অনার ও দেশ মাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তারা। তাদের মধ্যে আটজন অপ্রাপ্তি নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। নিরাশা আর হতাশা নিয়ে বেঁচে আছেন চারজন।  
  
আনসার সদস্য মৃত মফিজ উদ্দিনের স্ত্রী সকিনা বেগম জানান, সংসারে এতোই অভাব ছিল যে, টাকার অভাবে নিজের বাড়ির জমির খাজনা না দিতে পারায় জমি খাস হয়ে যায়। ২ ছেলে ও ১ মেয়ে রেখে তিনি ২০০৬ সালের ৪ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে বড় ছেলের ভ্যান চালানো আয়ের টাকা দিয়ে সংসার চলে। সেদিনকার ঘটনার জন্য তিনি ১৯৯৫ সালে পুরস্কার হিসাবে রুপার একটি মেডেল পেয়েছিলেন।  
  
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মানুষটি সংসার ছেলে-মেয়ের কথা চিন্তা না করে জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা যুদ্ধে গিয়েছিলেন। অথচ সেই যুদ্ধের পর টাকার অভাবে ঠিকমতো সংসার চলাতে পারেননি। এ জন্যই কি যুদ্ধ করেছিলেন? সরকারি অনুদান তেমন একটা পাননি। তার মৃত্যুর পর পরিবারের লোকজন একটি দু’রুম বিশিষ্ট ঘর বুঝে পেয়েছেন। কাগজে-কলমে ৫০ শতক খাস জমি বরাদ্দ পেলেও দখল পাননি আজও।  
  
মুজিবনগর কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশের খাসজমিতে ১২ আনসার সদস্যকে জমি দেয় সরকার। তাদের মধ্যে জীবিত হামিদুল ও সিরাজ এবং মৃত ফকির, নজরুল, মফিজ উদ্দীন, সাহেব আলী  ও মহিম উদ্দীনের পরিবার আজও ঘর বুঝে পাননি। স্থানীয় এক প্রভাবশালীর সঙ্গে মালিকানার দ্বন্দ্ব থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়। 

গার্ড অব অনার প্রদানকারী আজিমুদ্দিন শেখ বলেন, তখন করেছি স্বাধীনতাযুদ্ধ আর এখন করছি জীবনযুদ্ধ। দিনমজুরের কাজ করি। শরীরে তেমন শক্তি নাই। তারপরও অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করতে হয়। দিনমজুরি করে এখনও সংসার চালাতে হয়। জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চালাতেই হবে। তবে আশার কথা হলো তারা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এতে প্রতি মাসে ভাতা পাচ্ছেন। তাই দিয়েই কোনোমতে চলছে সংসার। 

আরেক গার্ড অব অনার প্রদানকারী লিয়াকত আলী বলেন, যে ভাতা পাই তাতে সংসার চলে না। শরীরে নানা রোগের বাসা। গায়ে খেটে জীবন ধারণ করি। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা মাসে দেড় হাজার টাকা ভাতা পাই। এ টাকা দিয়ে কি এখন সংসার চলে? 
  
জীবিত চারজন আনসার সদস্য আক্ষেপ করে বলেন, আমরা গার্ড অব অনার দিয়েছিলাম ১২ জন আনসার। অথচ মুজিবনগর কমপ্লেক্সের ভাস্কর্য বা ম্যুরালে দেখানো হয়েছে আটজনকে। ছবি থাকা সত্ত্বে সেখানে সকলের অবয়বও সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি।  
  
মুজিবনগর সরকারই দেশের প্রথম সরকার। এই সরকারের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে। ওইদিন শপথ গ্রহণ না হলে বাংলাদেশের মু্ক্তিযুদ্ধকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলন বলে বিশ্বের বুকে দাঁড় করাতো পাকিস্তান। তাই ইতিহাসের সাক্ষী আনসার সদস্যদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার দাবি জানান মেহেরপুর সরকারি কলেজের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল আমিন। 
  
তিনি বলেন, সাহসিকতার সঙ্গে ১২ আনসার সদস্য বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, তাতে রাষ্ট্রীয় পদক তারা পেতেই পারেন। জাতির এই বীর সন্তানদের সম্মান দেওয়া উচিত বলে মনে করেন স্থানীয়রাও। 

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.