সিলেটটুডে ডেস্ক | ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬
বুড়িগঙ্গা রিভারকিপারের উদ্যোগে শনিবার সকালে ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটের গোল টেবিল মিলনায়তনে ‘‘ট্যানারী স্থানান্তরে ব্যর্থ সরকারী ডেডলাইন ২০১৬! বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যাসহ একাধিক নদী – করণীয় কী ?” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
লেখক গবেষক ও বাপা’র সহসভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ এর সভাপতিত্বে এতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাপা’র যুগ্মসম্পাদক ও বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার শরীফ জামিল। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাপার জাতীয় পরিষদ সদস্য এম এস সিদ্দিকী, গ্রীন ভয়েস এর সমন্বয়ক আলমগীর কবির ও রিভারাইন পিপল এর মহাসচিব শেখ রোকন, সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার আব্দুল করিম কিম সহ আরো অনেকে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ তার বক্তব্যে বলেন, সরকার ট্যানারী শিল্প হাজারীবাগ থেকে সাভারের ট্যানারী শিল্প নগরীতে স্থানান্তরের যে ৭২ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিল সেটি ৭২ সপ্তাহ হলে কার্যকর করার একটি সম্ভাবনা দেখা যেত। এপর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া অনেক ডেডলাইন পার হয়ে গেছে কিন্তু সরকারের সকল ডেডলাইন ব্যর্থ হয়েছে এবং এর জন্য সরকারের কোন জবাবদিহিতা নেই। তিনি আরো বলেন, ট্যানারী শিল্প ও নদী দুটিই বাংলাদেশের সম্পদ এবং এ দুটিকে রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ট্যানারী শিল্পের অবদান ব্যাপক এবং নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ট্যানারী মালিকদের আচরনে মনে হয়, তারা সাভারের ট্যানারী শিল্প নগরীতে তাদের শিল্প স্থানান্তর করতে ইচ্ছুক আবার হাজারীবাগেও থাকতে চায়। সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন, আজ ট্যানারী শিল্প হাজারীবাগ থেকে সাভারের ট্যানারী শিল্প নগরীতে স্থানান্তরের শেষ দিন হলেও খুব বেশীসংখ্যক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর হয়নি। এবষিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি এবং ডেডলাইন দেওয়াতে কোন লাভ হয়েছে কি না ?
উপস্থিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ট্যানারী স্থানান্তরের ডেডলাইন আজ শেষ হলেও আমরা সরকারকে চাপ সৃষ্টি করতে পারি, প্রেস কনফারেন্স করতে পারি, আলোচনা সভা করতে পারি এবং আন্দোলন করতে পারি তবে বাকী কাজ অর্থাৎ ট্যানারী স্থানান্তরের কার্যকর পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে। আমরা চাই দুই পক্ষের দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে নদী ও ট্যানারী শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখে একটি কার্যকর সমাধানের পথ বের করা হোক।
বাপা’র যুগ্মসম্পাদক ও বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার শরীফ জামিল বলেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায় ৭০০০ হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান ঢাকার চারপাশের নদীসমূহকে দূষিত করছে, বুড়িগঙ্গা ছাড়াও তুরাগ, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা দূষিত হয়ে অবশেষে বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষিত করছে।
বিগত কয়েক বছর থেকেই সরকার ট্যানারি স্থানান্তরে কঠোর অবস্থান ব্যাক্ত করে আসছে । কারখানা মালিকদের উদ্দেশ্যে ডেডলাইন ঘোষণা করা হয়েছে একাধিকবার এবং প্রতিবারই সরকার ব্যার্থ হয়েছে । ২০১৬ সালেও হাজারীবাগ ট্যানারি উচ্ছেদে সরকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যাক্ত করে । ট্যানারি-মালিকদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর গত ২৭ নভেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, চলতি ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ট্যানারিগুলো হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর শেষ হবে । আগামীকাল থেকে হাজারীবাগে কোন চামড়া প্রবেশ করতে না দেয়ার কথা । কারখানা সমুহের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন করে দেয়ার ঘোষণাও শোনানো হয়েছে। সে হিসাবে ৩১ ডিসেম্বর অর্থাৎ আজকের দিনই হাজারীবাগ ট্যানারির শেষ দিন হিসাবে ধরে নেয়া যায় কিন্তু গতকাল সাভার চামড়া শিল্পাঞ্চল সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় যে সিইটিপি-এর অনেক অপরিহার্য অংশ এখনো তৈরি হয় নাই। চামড়াবর্জ্য শোধনের জন্য ডাম্পিং স্টেশনগুলো নির্মিত না হওয়ায় ৩৪ কারখানার বর্জ্যেই স্থানীয় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। দুর্গন্ধে আশপাশে যাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ । এখন ডাম্পিং স্টেশনের কাজ শুরু করলেও নির্মিত হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগবে। লবণপানি শোধনের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এ অবস্থায় প্রায় ৩৪টি কারখানা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু করেছে। যা নিয়মিত বর্জ্য উৎপাদন ও নিঃসরণ করে আসছে। ফলে এ সমস্ত বর্জ্য অপরিশোধিত অথবা আংশিক পরিশোধিত অবস্থায় পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীতে ফেলার প্রমান পাওয়া গেছে। অপরিশোধিত বর্জ্যের একটি অংশ নদীতীরবর্তী উন্মুক্ত জলাধারে ধরে রাখা হয়েছে। যা চুইয়ে চুইয়ে নদীতে গিয়ে মিশছে।
ফলে হাজারীবাগ ট্যানারি স্থানান্ত প্রক্রিয়ায় সঠিক পরিকল্পনার অভাব স্পস্ট। দীর্ঘ দিন থেকে আমরা সরকারকে ট্যানারি স্থানান্তর কর্মকান্ডে একটি বিষদ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা কঠোর ভাবে বাস্তবায়নের আহবান জানালেও তারা তা আমলে নেন নি। ফলে এই দূষণ এক নদী বুড়িগঙ্গা থেকে উজানে ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা ও তুরাগ সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জলাধারে ছড়িয়ে পরছে। যে সমস্ত ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয় নি তাদের ব্যাপারে কোন সুচিন্তিত ও বস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেই তেমনি ট্যানারি শিল্পের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের ব্যাপারেও কোন গ্রহণযোগ্য কর্মকান্ড জানা জায়নি।
এ অবস্থায় ট্যানারি দূষণের হাত থেকে নদীগুলো রক্ষার জন্যে আমরা সরকারের সুনির্দিস্ট পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ ও অনতিবিলম্বে সকল দূষণ বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।
সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার জনাব শরীফ জামিল বলেন যে, ট্যানারী মালিক ও সরকার দুপক্ষেরই দায় রয়েছে, কারণ ট্যানারী মালিকদের ট্যানারী স্থানান্তরের পূর্বে ট্যানারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ডিজাইন ও বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা দেখা যায় না আবার সরকার ট্যানারী স্থানান্তরের জন্য অবকাঠামোর পূর্ন বাস্তবায়ন করতে পারে নাই।
ডেডলাইন পরবর্তী সময়ে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা জরিমানা করছে কিন্তু এপর্যন্ত কত টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে তা সরকার প্রকাশ করছে না আর জরিমানা আদায় করা শেষ কথা নয় এটা বন্ধ করে ট্যানারী শিল্প অতিসত্বর স্থানান্তর করতে হবে। স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি যাতে অপরিকল্পিতভাবে না হয়ে, বিজ্ঞানসম্মত হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যে ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো রয়েছে তা সমাধান এবং কারিগরী দক্ষতা বাড়াতে হবে। সে সমস্ত কারণে এই স্থানান্তর এখনো সম্পন্ন হয়নি, তা চিহ্নিত করে দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আহবান জানান তিনি। ‘বুড়িগঙ্গা যে ভাবে দুষিত হয়েছে, এটি যেন সাভারের নদীতে না ঘটে, সেই বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।'