Sylhet Today 24 PRINT

রানা প্লাজা ট্রাজেডির দুই বছর: মামলার চার্জশিট হয়নি এখনও

নিউজ ডেস্ক  |  ২৪ এপ্রিল, ২০১৫

ঘটনার দুই বছর পরও এখনও ওখানে স্বজনেরা যান।  তারা জানেন লাশের অবশিষ্টাংশও পাবেন না তবু যান কারণ ওখানে হারিয়েছে তাদের স্বজন-পরিজন। এখনও রানা প্লাজার আশপাশে পাওয়া যায় হাড় আর মাথার খুলি। কেউ জানে এ হাড় আর খুলির পরিচয়! জানবেই বা কীভাবে হাড় আর খুলিতে ত খোঁদাই থাকে না মানুষের বাহ্যিক অবয়ব!

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা ৫০ মিনিট! দেশের শিল্পখাতে সবচেয়ে বড় দূর্ঘটনায় ধসে পড়ে সাভারের রানা প্লাজা। ভবনের নিচে চাপা পড়েন সাড়ে ৫ হাজার পোশাক শ্রমিক। এ ঘটনায় ১,১৩৫ জনের মৃত্যু হয়। আহত ও পঙ্গু হন প্রায় দুই হাজার মানুষ। ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে ২,৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। জীবিতদের মধ্যে পরে ১২ জন মারা যান।

ফাটল ধরা ভবনে কাজ করতে বাধ্য করাকে অনেকেই একে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করেছেন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় করা প্রধান দুটি মামলা এবং নিহত শ্রমিকের স্ত্রীর দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়নি, এমনকি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত জমা দিতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।

রানা প্লাজা ধসের পর স্থানীয় যুবলীগ নেতা সোহেল রানার মালিকানাধীন এই ভবন নির্মাণে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ একে একে বের হতে থাকে। ভবন ধসের ঘটনায় দুই মামলা হয়। কিন্তু দুই বছরেও তদন্ত শেষ করে আলোচিত দুই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল হয়নি।

অথচ এক বছর আগে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছিলেন, শিগগিরই তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

মামলার মোট ২১ আসামির মধ্যে প্রধান আসামি রানাসহ চারজন ছাড়া সব আসামি জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন বলে আদালতের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়।

এ পর্যন্ত মামলার ১৫টি ধার্য তারিখ পিছিয়েছে। সর্বশেষ এ মামলায় ১৬ এপ্রিল মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন ধার্য থাকলেও তা জমা হয়নি, পরিবর্তিত তারিখ রাখা হয়েছে ২১ মে।

ভবন ধসে প্রাণহানির ঘটনায় প্রথমে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগে মামলা করেন সাভার থানার এসআই ওয়ালী আশরাফ। সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করা হয় এ মামলায়। পরে মামলাটিতে অপরাধজনক প্রাণনাশের অভিযোগ আনা হয়। অপরাধজনক প্রাণনাশের অভিযোগ প্রমাণিত হলে এ মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

আর বিধি না মেনে রানা প্লাজা নির্মাণের অভিযোগে রানাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে ইমারত বিধির মামলাটি দায়ের করেন সাভার মডেল থানায় রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল আহমেদ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এ মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ দুই বছর শাস্তি হতে পারে।

এ পর্যন্ত আদালত ১৫ বার সময় দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন তৈরির জন্য। কিন্তু এতবার সময় নিয়েও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি তিনি।

ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি আনোয়ারুল কবীর বাবুল সাংবাদিকদের বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে দেরি হওয়ার কারণেই চারজন ছাড়া সকল আসামি জামিনের সুবিধা নিতে পেরেছে।”

অ্যাকশন এইডের জরিপে উঠে এসেছে, যারা সুস্থ হয়েছেন তাদের ৫৫ শতাংশই এখনও কাজ পাননি। আবার ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে বহু জনের। ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়েও বৈষম্যেরও অভিযোগ রয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা তিনটি মামলায়ই চার্জশিট প্রস্তুত করেছেন বলে জানিয়েছেন। তাতে অন্তত ৪০ জনকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে কারখানা মালিকপক্ষের ১৭ জন, ভবনের মূল মালিক সোহেল রানা, সাভারের সাবেক ইউএনও, পৌর মেয়র, পৌরসভার প্রকৌশলী ও রাজউক কর্মকর্তা রয়েছেন। অনুসন্ধানে সম্ভাব্য অভিযুক্তদের মধ্যে ৩৬ জনের নাম পাওয়া গেছে।

রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভারে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি অনুমোদনহীন বহুতল কারখানা ভবনটি ধসে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি নড়ে গিয়েছিল বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভিত। উদ্ধার কাজ চলার সময় যারা নিহত ও আহত স্বজনদেও খোঁজে ঘটনাস্থলে দিন-রাত অবস্থান করছিলেন, তাদের তখন একটাই আর্জি ছিল, রানা প্লাজার মালিকসহ দায়ীদের বিচার চাই। কিন্তু তাদেও সেই আরজি এখনও অপূর্ণই থেকে গেছে।

সিআইডির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, রানা প্লাজা ধসের পর গত এক বছরে মাত্র ২১ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ও পলাতক মিলিয়ে ৪২ জনের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত অভিযোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। শেষ পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ে আরও দু-একজনের নাম বাদ পড়তে পারে।

ভবনের নকশা প্রণয়নে জালিয়াতি, মূল নকশাবহির্ভূত বহুতল ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, নির্মাণ কাজ তদারক না করা, ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া, জোর করে ও ভয় দেখিয়ে কাজ করতে বাধ্য করা, অপরাধীকে আশ্রয় দেয়া এবং পালাতে সহায়তা করাসহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হচ্ছে চার্জশিটে।

হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে আবদুল খালেক ওরফে খালেক কুলু, মোহাম্মদ আলী খান, রেফাত উল্লাহ, আবুল হাসান, অনিল কুমার দাস, শাহ আলম মিঠু, এমায়েত হোসেন, রাকিবুল ইসলাম ও আলম মিয়া জামিনে রয়েছেন।

এছাড়া বজলুল সামাদ আদনান, মাহমুদুর রহমান, সোহেল রানা, আমিনুল ইসলাম, আনিছুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক খান, আলমগীর, রাসেল মধু ও সরোয়ার কারাগারে রয়েছেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.