রাইআন কাব্য | ২৮ এপ্রিল, ২০১৫
কারা হাসবে শেষ হাসি? প্রচলিত ধারণার আওয়ামিলীগ-বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী, নাকি অন্য কেউ? এমন প্রশ্নকে সামনে নিয়ে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার ভোটারেরা নির্ধারণ করতে যাচ্ছেন তাদের 'নগর নেতা'।
ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ভোটার ও প্রার্থীদের জন্যে আবার এ নির্বাচন অন্য রকমের। ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ডিসিসিকে উত্তর ও দক্ষিণ- এই দুই ভাগে বিভক্ত করার পর এটাই হচ্ছে তাদের প্রথম নির্বাচন। সে হিসেবে দুই সিটিতে যারা মেয়র, কাউন্সিলর এবং মহিলা কাউন্সিলর হবেন তাদের জন্যেও এক অনন্য অর্জন।
৬০ লাখের বেশি ভোটার অধ্যুষিত তিন সিটিতে এবার রেকর্ড সংখ্যক এক হাজার ১৮৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৪৮ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৮৯১ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২৪৯ জন প্রার্থী হয়েছেন।
কে কোথায় মেয়র প্রার্থী:
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থনে ঢাকা উত্তরে মেয়র পদে আনিসুল হক, দক্ষিণে সাঈদ খোকন ও চট্টগ্রামে আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং বিএনপির সমর্থনে ঢাকা উত্তরে তাবিথ আউয়াল, দক্ষিণে মির্জা আব্বাস ও চট্টগ্রামে এম মনজুর আলম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় পার্টি ঢাকা উত্তরে বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল, দক্ষিণে হাজী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন ও চট্টগ্রামে মো. সোলায়মান আলম শেঠকে সমর্থন দিয়েছে।
ঢাকা উত্তরে অন্যান্য মেয়র প্রার্থীরা হলেন- আবদুল্লাহ আল ক্বাফী, কাজী মো. শহীদুল্লাহ, চৌধুরী ইরাদ আহম্মদ সিদ্দিকী, নাদের চৌধুরী, মাহী বি. চৌধুরী, মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, মো. আনিসুজ্জামান খোকন, মো. জামান ভূঞা, মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকী, মো. সামছুল আলম চৌধুরী, শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ ও শেখ শহিদুজ্জামান।
ঢাকা দক্ষিণে অন্য মেয়র প্রার্থীরা হলেন- মো. গোলাম মাওলা রনি, আবু নাছের মুহাম্মদ মাসুদ হোসাইন, এএসএম আকরাম, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আয়ুব হোসেন, এসএম আসাদুজ্জামান রিপন, দিলীপ ভদ্র, বজলুর রশীদ ফিরোজ, মশিউর রহমান, মোহাম্মদ শফি উল্লাহ চৌধুরী, মো. আকতারুজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লাহ, মো. আবদুর রহমান, মো. আবদুল খালেক, মো. জাহিদুর রহমান, মো. বাহারানে সুলতান বাহার, মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, মো. শহীদুল ইসলাম ও শাহীন খান।
চট্টগ্রামে মেয়র প্রার্থীরা হলেন- আরিফ মইনুদ্দীন, এমএ মতিন, মোহা. শফিউল আলম, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. আলাউদ্দিন চৌধুরী, মো. ওয়ায়েজ হোসেন ভূইয়া, সাইফুদ্দিন আহমেদ রবি, সৈয়দ সাজ্জাদ জোহা ও হোসাইন মুহাম্মদ মজিবুল হক।
কোন সিটিতে কতজন কাউন্সিলর ও মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী:
ঢাকা উত্তর সিটিতে সাধারণ ৩৬ ওয়ার্ডে ২৮৩ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ও সংরক্ষিত ১২টি ওয়ার্ডে ৯০ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সাধারণ ৫৭ ওয়ার্ডে ৩৯১ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ও সংরক্ষিত ১৯টি ওয়ার্ডে ৯৭ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
চট্টগ্রাম সিটিতে ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৬২ জন ও ৪১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ২১৭ জন কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কোন সিটিতে কত ভোট:
ঢাকা উত্তর সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৪ জন। এর মধ্যে মহিলা ভোটার ১১ লাখ ২০ হাজার ৬৭৩ জন ও পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ২৪ হাজার ৭০১ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১ হাজার ৯৩টি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৩ জন। এর মধ্যে মহিলা ভোটার ৮ লাখ ৬১ হাজার ৪৬৭ জন ও পুরুষ ভোটার ১০ লাখ ৯ হাজার ২৮৬ জন।
চট্টগ্রাম সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৯ জন। এর মধ্যে মহিলা ভোটার ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৬ ও পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩ জন।
প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন:
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই তাদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে নির্বাচনের সরঞ্জামাদি। প্রস্তুত প্রশাসনও। ভোট গ্রহণের জন্য প্রায় অর্ধলক্ষ প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা নির্বাচনী মালামাল প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। রাতে কেন্দ্রে ওই মালামালসহ অবস্থান করছে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য ও ভোট গ্রহণ কর্মকর্তারা। সাধারণ কেন্দ্রে পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর ২২ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন সদস্য মোতায়েন থাকবে।
সুদৃঢ় নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
ঢাকা এবং চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে রোববার থেকে চার দিনের জন্য প্রায় ৮০ হাজার আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মাঠে নেমেছে। বিজিবি, র্যাব, পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনী এলাকায় টহল দিচ্ছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ভোট গ্রহণ উপলক্ষে পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে ২৬৮টি মোবাইল ফোর্স, ৬৬টি স্ট্রাইকিং ফোর্স, ২৬৮টি র্যাবের টিম, ১০০ প্লাটুন বিজিবি ও ৭ প্লাটুন কোস্টগার্ড সদস্য মাঠে রয়েছেন।
তিন সিটিতে ২৪ প্লাটুন বিজিবি রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। বিজিবির প্রতি প্লাটুনের সঙ্গে ২ জন করে ২০০ জন, র্যা বের সঙ্গে ১৩৪ জন ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে ৭ জন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনে সেনা সদস্যদের ক্যান্টনমেন্টে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটলেই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অনুরোধে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন।
নির্বাচন কমিশনের গোপন পর্যবেক্ষক টিম:
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কীনা তা পর্যবেক্ষণে তিন সিটিতেই ভোট কেন্দ্র পাহারায় গোপন পর্যবেক্ষক হিসেবে ৪৫ কর্মকর্তাকে নিয়োগ করেছে ইসি। কমিশনের তথ্যমতে, ঢাকা দক্ষিণে ১৯ জন, উত্তরে ১২ জন এবং চট্টগ্রামে ১৪ জন কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পালন করবেন।
সেনা মোতায়েন নিয়ে ইসির ইউটার্ণ :
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সেনা বাহিনী মোতায়েন করা হবে এমন ইঙ্গিত দেওয়ার এক দিন পর আবার ইউটার্ণ নিয়ে জানানো হয় সেনাবাহিনী মাঠে নয় ক্যান্টনমেন্টে থাকবে। আওয়ামিলীগ সমর্থিত প্রার্থী ছাড়া অধিকাংশ প্রার্থীই নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিলেন। শেষ মুহুর্তে ইসির এই সিদ্ধান্ত সমালোচিত হয়।
তবে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৯ম অধ্যায় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত ইনস্ট্রাকশন রিগার্ডিং এইড টু সিভিল পাওয়ার’র সপ্তম ও দশম অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ও নিয়ম অনুযায়ী সেনাবাহিনী পরিচালিত হবে। মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বেসামরিক প্রশাসনকে আইনশৃংখলা রক্ষায় সহায়তা করবে।
এজন্য মিরপুর সেনানিবাসে ২ জন, পোস্তগোলা সেনানিবাসে ২ জন, ঢাকা সেনানিবাসে ৬ জন, দামপাড়া সেনানিবাসে ২ জন, হালিশহর সেনানিবাসে ২ জন ও চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ২ জনসহ মোট ১৬ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অবস্থান করবেন। নির্বাচনী পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মনিটরিং সেল স্থাপন করা হবে।
নির্দলীয় নির্বাচন দলীয় নির্বাচনে পরিণত:
নির্দলীয় নির্বাচন পরিণত হয়েছে দলীয় নির্বাচনে। নির্বাচনি বিধিমালা অনুযায়ি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কোন দলের নাম ব্যবহার করা যাবে না উল্লেখ থাকলেও এ বিধান মানেনি কেউ। বড় দলগুলো থেকে শুরু করে ছোট ছোট দলগুলো সবার ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে নির্দলীয় নির্বাচন বলা হলেও এখন এসব নির্বাচনেও দলীয় প্রকাশ জোরেশোরে লক্ষ্য করা যায়। ভোটারদের স্বাভাবিক বিভক্তি কিংবা মেরুকরণও আসে দলীয়ভাবে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে সে প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়, ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম নয়।