Sylhet Today 24 PRINT

গাবতলীতে রাতে পরিবহণ শ্রমিকদের তাণ্ডব

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০১ মার্চ, ২০১৭

সারাদেশে হঠাৎ পরিবহন ধর্মঘটের মধ্যেই মঙ্গলবার বিকেল থেকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজধানীর গাবতলী এলাকা। মধ্যরাত পর্যন্ত সেখানে ব্যাপক তাণ্ডব চালায় পরিবহন শ্রমিকরা। তারা গাবতলীর প্রধান সড়কসহ আশপাশের সড়কগুলো বন্ধ করে নির্বিচারে গাড়ি ভাংচুর চালায়। আগুনে পুড়িয়ে দেয় পুলিশ বক্স ও পুলিশের একটি রেকারসহ অন্তত চারটি গাড়ি। রক্ষা পায়নি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও।

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে শ্রমিকরা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক পর্যায়ে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ বাধে। গোটা এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। দুর্বিষহ ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। রাত সাড়ে ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত গাবতলীতে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছিল। পুলিশ কয়েকশ' রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছিল। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়েন করা হয়। র‌্যাব সাঁজোয়া যান নিয়ে ওই এলাকায় টহল শুরু করে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আসলামুল হক আসলামও শত শত নেতাকর্মী নিয়ে শ্রমিক তাণ্ডব প্রতিহত করতে রাস্তায় নামেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, শ্রমিকরা বিনা উস্কানিতেই অন্তত ৪০টি গাড়ি ভাংচুর করে।

সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর জন্য দায়ী বাসচালককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে গত সপ্তাহে মানিকগঞ্জের আদালতে রায়ের পর থেকে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এর পর সাভারে এক নারীর ওপর ট্রাক তুলে হত্যার অপরাধে আরেক চালকের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর শুরু হয় দেশজুড়ে আকস্মিক ধর্মঘট। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের জনজীবনে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। ঢাকার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো দেশ। মঙ্গলবার সকালে গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়তে বাধা দেয় ধর্মঘটের পক্ষের শ্রমিকরা। বেলা গড়ানোর পরপরই উত্তপ্ত হতে থাকে গাবতলী। এদিকে ঢাকার অন্যতম প্রবেশপথ গাবতলীতে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের জেরে ঢাকা থেকে সাভার ও আশপাশের উপকণ্ঠে অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় বিভিন্ন অফিস থেকে সাভার ও ওইসব এলাকার বাসিন্দারা বাসায় ফেরার পথে ভোগান্তিতে পড়েন। তারা শ্রমিকদের মারমুখী আচরণের কারণে হেঁটেও ওই পথে যেতে পারছিলেন না। সংঘর্ষের কারণে মধ্যরাত পর্যন্ত মিরপুরের টেকনিক্যাল মোড়, কল্যাণপুর, মিরপুর-১ থেকে ২ নম্বর পর্যন্ত যানজটের সৃষ্টি হয়।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে এমপি আসলামুল হক আসলাম কয়েকশ' নেতাকর্মী নিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। তারা ওই এলাকার সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। এর আগে আসলামুল হক আসলাম বলেন, অন্যায্য দাবি আদায়ে শ্রমিকরা ভাংচুর করে তাণ্ডব চালিয়েছে। তাদের যে দাবি তা আদালতেই সুরাহা হওয়ার বিষয়। ধর্মঘটে অন্যান্য এলাকা শান্ত থাকলেও গাবতলীতে এমন ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গাবতলী এলাকায় অনেক শ্রমিক নেতার অবস্থান। এজন্যই এ এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে।

আসলামুল হক শ্রমিকদের গাড়িতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রকৃত শ্রমিকরা গাড়ি ভাংচুর করতে পারে না। একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিস্থিতি উত্তপ্ত করছে। তাদের প্রতিরোধে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবে। আন্দোলনে থাকা শ্রমিকদের কয়েকজন অবশ্য দাবি করেছে, তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কে বা কারা গাড়ি ভাংচুর করে শ্রমিকদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকেল সাড়ে ৩টা থেকেই মিরপুর মাজার রোড থেকে শুরু করে আমিনবাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ বন্ধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে শ্রমিকরা। ওই এলাকায় প্রাইভেটকার চালাতে গেলেও তা নির্বিচারে ভাংচুর করা হয়। পর্বতা সিনেমা হলের সামনে টায়ার জ্বালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।

সন্ধ্যার পর গাবতলী ও মাজার রোড এলাকায় গিয়ে শত শত শ্রমিককে মারমুখী অবস্থায় দেখা গেছে। তারা থেমে থেমে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল মারছিল। পুলিশও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। রাত ৮টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ওই এলাকায় অন্তত তিনটি অ্যাম্বুলেন্স ভাংচুর করে তারা। সড়কের দুই পাশের সিসিটিভি ক্যামেরাও খুলে ফেলতে দেখা যায়। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরাও লাঞ্ছিত হন।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভাংচুর থামাতে গেলে শ্রমিকরা গাবতলী পুলিশ ফাঁড়িতে থাকা পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। খবর পেয়ে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করে। এরই মধ্যে একটি রেকার ও পুলিশ বক্সে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও তারা ঢুকতে দিচ্ছিল না। রাত সাড়ে ১০টার দিকেও রেকারটি জ্বলতে দেখা যায়।

শ্রমিকদের মারধরের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সাধারণ মানুষ। সন্ধ্যার পর তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেসের কর্মস্থল থেকে মোটরসাইকেলে সাভারের বাসায় ফিরছিলেন জাহিদুল ইসলাম। গাবতলী টার্মিনালের পাশে একদল শ্রমিক তার মোটরসাইকেল থামিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রতিবাদ করলে শ্রমিকরা তাকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখে।

মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে কল্যাণপুরে হানিফ পরিবহনের সামনে স্ত্রী ও শিশুসন্তান রূপাকে নিয়ে বসেছিলেন সফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, সকাল ৮টার দিকে তিনি কক্সবাজার থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কল্যাণপুর আসেন। গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালীতে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেও কোনো গাড়ি পাননি। এর মধ্যে মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেও ওষুধের দোকানও খোলা পাচ্ছেন না।

ওই এলাকাতেই বসে ছিলেন ভাই চুন্নুকে নিয়ে কোহিনূর বেগম। তিনি ফরিদপুর যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করলেও গাড়ি পাচ্ছিলেন না। কোহিনূর বেগম জানান, কী করবেন, তাও বুঝতে পারছেন না।

পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আহম্মেদ জানান, ধর্মঘটের মধ্যে মানুষের ভোগান্তি কমাতে গাবতলীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। সাধারণ যাত্রীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের পরামর্শ দেওয়ার সময় উত্তেজিত একদল শ্রমিক বিনা উস্কানিতে তাণ্ডব শুরু করে।

দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান জানান, শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। তারা সড়কে গাড়ি দেখলেই ভাংচুর করে। পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।

সূত্র : সমকাল

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.