ডেস্ক রিপোর্ট | ০৩ মে, ২০১৫
মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় এ বছর ‘দ্যা ববস- সেরা অনলাইন অ্যাক্টিভিজম’ পুরস্কার পেয়েছে মুক্তমনা ব্লগ। ‘দ্যা ববস’র আয়োজক জার্মানির আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২০১৫ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
শনিবার জার্মানির রাজধানী বার্লিনে এক বৈঠকে জুরিমণ্ডলী একাদশের আয়োজনের বিজয়ীদের নাম চূড়ান্ত করে। এ বছর বাংলাদেশ, সিরিয়া এবং মেক্সিকোর ব্লগাররা পাচ্ছেন এই পুরস্কার।
আগামী জুন মাসে জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠেয় গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে৷ চলতি বছর সামাজিক পরিবর্তন, গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষা এবং শিল্প ও সংবাদমাধ্যম– এই তিনটি বিভাগে জুরি অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে।
দ্য ববস’র ‘সামাজিক পরিবর্তন’ বিভাগে জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বন্যা। বন্যার স্বামী অভিজিৎ রায় ছিলেন মুক্তমনা ব্লগসাইটের পরিচালক। ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অভিজিৎ ও বন্যা বইমেলায় অংশ নিতে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। খবর সূত্র: ডয়চে ভেলে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইসলামিস্ট জঙ্গিদের হামলায় প্রাণ হারান মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ব্লগার অভিজিৎ রায়৷ হামলায় তাঁর স্ত্রী এবং সহব্লগার রাফিদা বন্যা আহমেদও গুরুতর আহত হন৷ বাংলাদেশের পুলিশ এখনো এই হামলার কারণ এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করতে না পারলেও, ব্লগাররা বিশ্বাস করেন যে উগ্র ইসলামপন্থিরাই ব্লগার দম্পতির ওপর হামলা চালায়৷
জার্মানির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে গত কয়েক বছর ধরেই মুক্তমনা ব্লগের দিকে নজর রাখছিল৷ ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা কাণ্ড পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করেছে ডয়চে ভেলে৷ এরপর এপ্রিলে ডয়চে ভেলের দ্যা ববস প্রতিযোগিতায় মুক্তমনা ব্লগ তথা রাফিদা বন্যা আহমেদের ব্লগকে মনোনয়ন দেয়া হয়৷ শনিবার দ্যা ববস-এর বিচারকরা বার্লিনে এক বৈঠকে চূড়ান্ত বিজয়ীদের নির্ধারণ করেন৷
প্রতিযোগিতার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ‘সামাজিক পরিবর্তন' বিভাগে দীর্ঘ আলোচনা এবং ভোটাভুটির পর মুক্তমনা ব্লগকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়৷ আগামী জুন মাসে জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিতব্য গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে এক অনুষ্ঠানের মুক্তমনা ব্লগার রাফিদা বন্যা আহমেদ এই পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেন৷
এদিকে, ডয়চে ভেলের দ্যা ববস অ্যাওয়ার্ড জয়ের খবরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে মুক্তমনা ব্লগ সাইটের মডারেটর টিম৷ এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছেন, ‘‘ডয়চে ভেলের অত্যন্ত সম্মানজনক অনলাইন অ্যাক্টিভিজম অ্যাওয়ার্ড ‘দ্যা ববস' পাওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত৷ যাঁরা মুক্তমনাকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনিত করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা রইলো৷
বিবৃতিতে লেখা হয়েছে, ‘‘একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক এবং বিজ্ঞানমুখী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য, একটি উদার, প্রগতিশীল এবং বিজ্ঞানমনষ্ক প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য মুক্তমনা অনলাইনে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে গত ১৪ বছর ধরে৷ এই পুরস্কার আমাদের সেই অক্লান্ত পরিশ্রমেরই স্বীকৃতি৷''
মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুষর বিষয়টি উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘অভিজিৎ রায়ের অপ্রত্যাশিত হত্যাকাণ্ডের পরে মুক্তমনা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে পড়েছিল হতবিহ্বল, বিচলিত এবং শোকগ্রস্ত৷ এই পুরস্কার প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে আমাদের সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সহায়তা করবে৷ আগামী দিনে আরো ভালো কিছু করার জন্য অনুপ্রেরণা দেবে, উৎসাহ যোগাবে৷''
দ্যা ববস-এর জুরিমণ্ডলীর সদস্য' প্রখ্যাত আলোকচিত্রী এবং মানবাধিকার কর্মী ড. শহিদুল আলম মুক্তমনা ব্লগের জয় প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘এটা কোনো সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না৷ প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকটি মনোনয়ন জমা পড়েছিল, যেগুলোর প্রতি মনোযোগ প্রয়োজন ছিল৷ নিশ্চিত বিপদের কথা জেনেও মুক্তমনা ব্লগের ব্লগাররা বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যলবস্থা, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন৷ তাঁদের এই সাহসিকতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে দ্যা ববস৷''
শহিদুল বলেন, ‘‘বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে ৮৪ জন মুক্তমনা ব্লগারকে হত্যাঁর হুমকি দেয়া হয়েছিল৷ এঁদের মধ্যেে আটজন ইতোমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন৷ একটি দমনমূলক পরিবেশে, যেখানে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে অবস্থানরত ব্লগারদের সহায়তায় তাই সবাইকে সক্রিয় হতে হবে৷''
প্রসঙ্গত, অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর মুক্তমনা ব্লগকে এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠায় স্বামীর সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্ত্রী বন্যা আহমেদ৷ ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বাংলাদেশে ব্লগাররা অত্যদন্ত ঝুঁকির মুখে রয়েছে৷ আর এই ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেশি৷ তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ সরকারের এক্ষেত্রে অনেক বেশি সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন৷ সরকারকে এ সব হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাতে হবে, হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে এবং বাংলাদেশে বিচারহীনতার যে ধারা শুরু হয়েছে তা বন্ধ করতে হবে, বলেন আহমেদ৷
বাংলা ব্লগারদের নিয়ে ডয়চে ভেলের ‘কাভারেজ' সম্পর্কে সচেতন আহমেদ৷ অভিজিতকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের একটি আঙুল হারিয়েছেন তিনি৷ মাথায়ও একাধিক কোপ লেগেছে৷ বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বন্যা৷ ডয়চে ভেলেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি, আহ্বান জানিয়েছেন অভিজিৎ হত্যা্কাণ্ড নিয়ে লেখালেখি অব্যাহত রাখার৷ বাংলাদেশে মুক্তমনা ব্লগারদের বিপদের কথা গোটা বিশ্বকে জানাতো উচিত বলে মনে করেন বন্যা আহমেদ৷
উল্লেখ্য , ২০০৯ সালে ডয়চে ভেলের দ্যা ববস প্রতিযোগিতায় বাংলা ভাষা যোগ করা হয়৷ এরপর এখন পর্যন্ত পাঁচজন বাংলাভাষী ব্লগার এই প্রতিযোগিতায় জুরি অ্যাওয়ার্ড জয় করেছে৷
মুক্তমনা অভিজিৎ রায় (১৯৭২-২০১৫) কর্তৃক ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং মুক্তচিন্তক, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদীদের দ্বারা পরিচালিত একটি আন্তর্জালিক আলোচনা চক্র। মুক্তমনা বর্তমান সমাজে বিদ্যমান অদৃষ্টবাদ, ভাববাদ আর বিশ্বাসনির্ভর লাগাতার প্রকাশনা আর প্রচারণার বিপরীতে একটি বিজ্ঞানমনস্ক এবং যুক্তিবাদী ধারা প্রবর্তনে বদ্ধপরিকর।