সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৯ মার্চ, ২০১৭
রাজধানীর আশকোনায় র্যাব ক্যাম্পে আত্মঘাতী হামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে আটকের পর মারা যাওয়া যুবক আবু হানিফ মৃধাকে ডিবি পরিচয়ে আগেই তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে তার পরিবার।
গত ৪ মার্চ এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়। হানিফের সঙ্গে তার বন্ধু সোহেলও নিখোঁজ হয় বলে ওই জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, র্যাব ক্যাম্পে নিহত আত্মঘাতী হামলাকারী যুবকের পরিচয় রাত পর্যন্ত মেলেনি বলে র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ওই যুবকের ছিন্নভিন্ন দেহ এখনও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রয়েছে।
গত শুক্রবার দুপুরে আশকোনায় র্যাব ক্যাম্পে (প্রস্তাবিত র্যাব সদর দফতর) আত্মঘাতী হামলায় এক যুবক নিহত হয়। ওই ঘটনার পর র্যাব সদস্যরা আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে আবু হানিফ মৃধা নামের ওই যুবককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেন। পরের দিন শনিবার হানিফ কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মারা গেলে র্যাব তাকে আগের দিন আটকের কথা স্বীকার করে।
শনিবার র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছিলেন, শুক্রবার দুপুরে আত্মঘাতী হামলার পর আশপাশের এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী বিমানবন্দরের মুনমুন কাবাবের পেছন থেকে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে আবু হানিফ নামের সন্দেহভাজন এক যুবককে আটক করলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চিকিৎসককে উদ্বৃত করে ওই দিনই বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এজাজ শফী জানিয়েছিলেন, হার্ট অ্যাটাকে হানিফের মৃত্যু হয়েছে।
হানিফের পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, র্যাব বা ডিবি পরিচয়ে বিভিন্ন সময়ে পেশাদার অপহরণকারী চক্র অপহরণ করে থাকে। বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের অপরাধী চক্রকেও ধরা হয়েছে। হানিফের পরিবারের অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
হানিফের বাবা আবদুস সোবহান জানান, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি হানিফ ও তার বন্ধু সোহেল বরিশালে চরমোনাই পীরের মাহফিল থেকে লঞ্চে কাঁচপুর সেতুর কাছে নামে। সেখান থেকেই তাদেরসহ দু’জনকে ডিবি পরিচয়ে হাইয়েস মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। পুরো ঘটনাই দেখতে পায় তাদের আনতে যাওয়া প্রাইভেকার চালক জুয়েল। পরে জুয়েল তাদের জানিয়েছে, হানিফ ও সোহেলকে মাইক্রোবাসে তোলা হলেও ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন অস্ত্রের মুখে তার প্রাইভেটকারে ওঠে। এরপর তারা তাকে মারধর করে পূর্বাচলে ফেলে গাড়ি নিয়ে চলে যায়।
আবদুস সোবহান বলেন, তার ছেলে অপরাধী নয়। একসময় বাসে কন্ডাক্টর ও ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করলেও এখন তার তিনটি বাস ও একটি প্রাইভেটকার রয়েছে। সে এগুলো দিয়ে পরিবহন ব্যবসা করে।
হানিফের ছোট ভাই আবদুল হালিম জানান, তার ভাই নিখোঁজ হওয়ার খবরে তিনি ঢাকায় এসে ভাইকে খোঁজাখুঁজি করেও পাননি। এরপর চালক জুয়েলের কাছ থেকে সব শুনে গত ৪ মার্চ সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় জিডি করেন।
তিনি দাবি করেন, গত বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে র্যাব-১-এর একটি গাড়ি ও সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাস ঢাকার রায়েরবাজারে তাদের বাসায় আসে। সাদা গাড়ি থেকে চার-পাঁচজন হানিফকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ঢোকে। তারা কুলসুম ভাবিকে (হানিফের দ্বিতীয় স্ত্রী) বলে, আপনার স্বামী একটি অন্যায় কাজে সহযোগিতা করেছে। এরপর হানিফের চেকবই এনে ছয় লাখ ৭০ হাজার টাকার চেকে সই করিয়ে হানিফকে নিয়ে চলে যায়। কী অন্যায় করেছে, তা তারা বলেনি। যাওয়ার সময় বাসায় রাখা হানিফের পালসার ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলও নিয়ে যায় তারা।
হালিমের দাবি, বাসায় আসা লোকজনের মধ্যে একজন র্যাবের পোশাক পরা ছিল। তার হাতে অস্ত্রও ছিল। তার বুকের মধ্যে নেমপ্লেটে ইকবাল লেখা ছিল। শনিবার তারা টেলিভিশনে দেখতে পান, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে র্যাবের হাতে আটক হানিফ নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে। তখন তারা সেখানে গিয়ে তার পরিচয় শনাক্ত করেন।
এদিকে বরগুনা জেলা পুলিশ সুপার বিজয় বসাক জানান, হানিফ কয়েক বছর ধরে বরগুনার বাইরে থাকতেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তাই স্থানীয় পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধ কোনো অভিযোগ নেই।
স্বজনরা জানান, হানিফের দুই স্ত্রীর মধ্যে প্রথম স্ত্রী লাইলী বেগম তিন শিশুসন্তান নিয়ে গ্রামের বাড়ি বরগুনার আমতলী উপজেলার আমড়াগাছিয়ায় থাকেন। দ্বিতীয় স্ত্রী কুলসুম দুই সন্তান নিয়ে ঢাকার রায়েরবাজারে ভাড়া থাকতেন।
এদিকে হানিফের সঙ্গে নিখোঁজ সোহেলের একজন স্বজন জানিয়েছেন, সোহেলের বাড়ি বরগুনার তালতলীর ছোট বাইজরাত এলাকায়। তবে তিনি যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে থাকতেন। গুলশান ২ নম্বরে তার পুরনো ফার্নিচারের ব্যবসা রয়েছে। হানিফের লাশ পেলেও এখন পর্যন্ত সোহেলের সন্ধান মেলেনি।
সূত্র : প্রথম আলো, সমকাল