নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৫ এপ্রিল, ২০১৭
সরকারের পক্ষ থেকে করোনারি স্টেন্ট বা হার্টের রিংয়ের মূল্য নির্ধারণ করার আবেদন জানিয়ে একটি অনলাইন পিটিশন খোলা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে করা এ অনলাইন পিটিশনে করোনারি স্টেন্টের অবৈধ বাণিজ্য করছে উল্লেখ করে অবিলম্বে এটা বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে।
জানা যায়, একক রোগ হিসেবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর সবচে বেশি মানুষ মারা যায়। বিগত বছরগুলোতে জীবন যাত্রার ধরন ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের অসংক্রামক রোগ যেমন উচ্চ-রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার, ইত্যাদি রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। ইদানিং শুধু উচ্চবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষদের মধ্যেও অনেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের দেশে হৃদরোগের কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে এনজিওপ্লাস্টি চালু হবার পর দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত বহু রোগি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। তবে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো অধিকাংশ মানুষের সাধ্যের বাইরে।
বাংলাদেশে এখন প্রায় অর্ধশত ক্যাথল্যাবে এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে করোনারি স্টেন্টিং বা হার্টে রিং পরানোর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রতিদিন এই ক্যাথল্যাবগুলোতে প্রায় শতাধিক রোগির এনজিওপ্লাস্টি করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এনজিওপ্লাস্টি করার ক্ষেত্রে যেসব করোনারি স্টেন্ট বা হার্টের রিং ব্যবহার করা হয় তার সবগুলোই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ সমস্ত রিং আমদানির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র ১৫-২০ টি প্রতিষ্ঠানের বৈধ নিবন্ধন থাকলে বর্তমানে একশোরও বেশি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে স্টেন্ট আমদানি করছে।
অনলাইনে খোলা এ পিটিশন সূত্রে জানা যায়, করোনারি স্টেন্ট আমদানি সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে করোনারি স্টেন্টের মূল্য নির্ধারণ করে না দেয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত রোগিদের এসব স্টেন্ট কয়েকগুণ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারী ও প্রাইভেট হাসপাতালে ৫-৭ হাজার টাকা মূল্যের করোনারি স্টেন্ট ৪০-৬০ হাজার টাকা, এবং ৩৫-৪০ হাজার টাকা মূল্যের স্টেন্ট ১.৫ -২.৫ লাখ টাকা রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪ শতাধিক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ থাকলেও তাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন এনজিওপ্লাস্টি করতে থাকেন।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সম্প্রতি উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে করোনারি স্টেন্টের দাম ৮৫% পর্যন্ত কমিয়ে আনলেও এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না বলে পিটিশনে জানানো হয়।
করোনারি স্টেন্টের মূল্য নির্ধারণ বিষয়ক অনলাইনে খোলা এ পিটিশনের উদ্যোক্তা ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুসারী কার্ডিয়াক স্টেন্ট একটি 'ডি' ক্যাটাগরির মেডিকেল ডিভাইস যার উৎপাদনকারী বা আমদানিকারককে অবশ্যই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধিনে পরিচালিত ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত হতে হবে। এ ধরনের মেডিকেল ডিভাইসের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার দায়িত্ব ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের হলেও কোন এক অজানা কারণে সেটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, অসংখ্য অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান কয়েক গুণ বেশি দামে স্টেন্ট বিক্রি করে যাচ্ছে। এসব নাম গোত্রহীন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা লাখ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করলেও ক্রেতা অর্থাৎ রোগিকে কখনই কোন ধরনের রশিদ প্রদান করে না। ফলে রোগির পক্ষ থেকে পরবর্তীতে কোন অভিযোগ আনারও সুযোগ থাকে না।
পিটিশনে কয়েকটি দাবি জানানো হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে:
১) রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন ফর মেডিক্যাল ডিভাইসেস ২০১৫ এবং ড্রাগ অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ এর নির্দেশনা অনুসারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক একটি 'ডি' ক্যাটাগরির মেডিকেল ডিভাইস হিসেবে অবিলম্বে সব ধরনের করোনারি স্টেন্টের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হোক।
২) সব ধরনের করোনারি স্টেন্ট আমদানিকারকদের ওষুধ প্রশাসন কর্তৃক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হোক। এবং অবৈধ আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
৩) সরকার নির্ধারিত করোনারি স্টেন্টের মূল্য তালিকা এবং বৈধ আমদানিকারকদের নাম দেশের প্রতিটি ক্যাথল্যাবের সামনের দেয়ালে টাঙানো বাধ্যতামূলক করা হোক।
৪) কোন হাসপাতাল নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দাম আদায় করলে অনতিবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
৫) ক্যাথল্যাবের মত স্পর্শকাতর একটি বিভাগে স্টেন্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত যে কোন ব্যক্তির প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হোক।
৬) বিনা প্রয়োজনে বা অতিরিক্ত স্টেন্ট ব্যবহার বন্ধ করতে এনজিওপ্লাস্টি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন কার্ডিয়াক সার্জনের মতামত নেয়া বাধ্যতামূলক করা হোক।
৭) সরকারি উদ্যোগে আরো অধিক সংখ্যক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের এনজিওপ্লাস্টির উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হোক।