Sylhet Today 24 PRINT

যাবজ্জীবন থেকে ছয় মাসের দণ্ড, যা বললেন আদালত

রাজন হত্যায় হাইকোর্টের রায়

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১২ এপ্রিল, ২০১৭

শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলায় চার আসামির ফাঁসি ও পাঁচজনের কারাদণ্ডের রায় বহাল থাকলেও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামির সাজা কমিয়ে ছয় মাসে নিয়ে এসেছেন হাই কোর্ট।

আসামিদের মধ্যে নূর মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালত। হাই কোর্টের রায়ে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আসামিদের আপিল শুনানি শেষে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এ রায় দেয়।

বাকি আসামিদের মধ্যে কামরুল ইসলাম, ময়না চৌকিদার, তাজউদ্দিন আহমদ বাদল ও জাকির হোসেন পাভেল আহমদের মৃত্যুদণ্ড; কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহমদের সাত বছরের কারাদণ্ড এবং দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীর এক বছর করে কারাদণ্ডের রায় বহাল রেখেছে হাই কোর্ট।

একটি রিকশা ভ্যান চুরির অভিযোগ তুলে ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে ১৩ বছর বয়সী রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মূল আসামি কামরুলের সহযোগী নূর মিয়া সেদিন রাজনকে পেটানোর দৃশ্য ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেন। ওই ঘটনায় সারা দেশে তৈরি হয় তীব্র ক্ষোভ।

মঙ্গলবার হাই কোর্টের রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন তার পর্যবেক্ষণে বলেন, “এই মামলায় ইনটেনশন খোঁজার দরকার নেই। ঘটনাক্রমই ইনটেনশন ডেভেলপ করেছে।”

তিনি বলেন, ঘটনার এক পর্যায়ে রাজন পানি চাইলেও তাকে পানি দেওয়া হয়নি। মৃত্যুর আগেও তাকে পানি না দিয়ে ‘নিষ্ঠুর, নৃশংস, অমানবিক ও জঘন্য অপরাধ’ করেছে আসামিরা।

“ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট, নির্যাতনের কারণে ঘটনাস্থলেই রাজনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় যারা অংশ নিয়েছে, তারা দলগতভাবে পশুর মত আচরণ করেছে। তারা মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছিল এবং সে সময় তারা যে আচরণ করেছে তা ছিল অমানবিক।”

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্কে ওই ভিডিওকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের বিরোধিতা করেছিলেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “এ মামলায় ভিডিও ফুটেজ এভিডেন্স হিসেবে গ্রহণ না করার কোনো যৌক্তিক কারণ আমরা খুঁজে পাইনি। এ মামলায় ভিডিও ফুটেজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এভিডেন্স।”

বিচারিক আদালতে নূর মিয়ার যাবজ্জীবন দণ্ডের আদেশের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে তার আইনজীবী হাই কোর্টে বলেন, অপরাধের কোনো পর্যায়েই নূর মিয়া অংশ নেননি। ওই অপরাধে উৎসাহ বা আদেশ দেননি। হত্যার ক্ষেত্রে তার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। এমনকি পরবর্তীতে অপরাধীদের রক্ষার কোনো চেষ্টাও তিনি করেনি।

শুনানিতে আইনজীবী দাবি করেন, নূর মিয়া কৌতুহলবশত ঘটনাটি ভিডিও করেন। সেজন্য তাকে পুরস্কৃত করা উচিৎ, কারণ ওই ভিডিওর ভিত্তিতেই এ মামলার বিচার হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, “নূর মিয়া ঘটনার বিষয়ে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে পারত। সেজন্য যথেষ্ট সময়ও তিনি পেয়েছিল। কিন্তু সে তা করেনি এবং ঘটনা তদন্তের পর্যায়েও কোনো সহযোগিতা করেনি। সে পালিয়েছে এবং পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। ফলে সে দায় এড়াতে পারে না।”

হাই কোর্ট বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম রায়ের সময় তার লিখিত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, কোনো অপরাধ করার অভিযোগে যদি কাউকে সাধারণ মানুষ আটক করে, তাহলে আইন অনুযায়ী তাকে নিকটস্থ থানায় সোপর্দ করা, কিংবা পুলিশকে অবহিত করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। এর পরিবর্তে কেবল ধারণা থেকে আকস্মিক কোনো সিদ্ধান্ত কখনোই শুভ ফল বয়ে আনে না।

এই মামলায় আসামিপক্ষের অভিযোগ– ভিকটিম রাজন একটি রিকশা চুরি করার চেষ্টা করে এবং আসামিরা ক্রোধের বশে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। কিন্তু ওই যুক্তির পক্ষে কোনো প্রমাণ তারা হাজির করতে পারেনি বলে পর্যবেক্ষণে জানান বিচারক।

তিনি বলেন, “যখন এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটে তখন পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা কঠিন। মৌলক আইন এবং সচেতনতার মাধ্যমে আমাদের অবশ্যই সামাজিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তা না হলে সমাজে ভুল বার্তা পৌঁছাবে এবং সাধারণ মানুষ বিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে শুরু করবে।”

সবাইকে সতর্ক করে বিচারক বলেন, এরকম পরিস্থিতিতে নিরপরাধ মানুষও দোষী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। এই মামলা থেকে মানুষ জানবে, আইন নিজের হাতে নিয়ে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত হবে, তাদের ফাঁসিকাষ্ঠ বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

“সমাজকে নিরাপদ করতে রাষ্ট্রসহ আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে, যাতে রাজনের মত আর কোনো ঘটনা না ঘটে।”

পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, শিক্ষার অভাবের কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষের আইন সম্পর্কে মৌলক ধারণাও নেই। আইন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনা তৈরিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদিক, সকল ধর্ম প্রচারকদের এগিয়ে আসতে হবে।

“সামাজিক আন্দোলনও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আইন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত কার উচিৎ।”

রায় পড়া শুরু করার আগে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম আদালতের আদেশ নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে প্রতিক্রিয়া দেখানোর বিষয়ে সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, “বিচারকের কাছে সবাই সমান। অপরাধী কখনও ধনী-গরিব হয় না। সাধারণ মানুষের ইমোশন থাকতে পারে, কিন্তু বিচারকদের ইমোশন থাকতে পারে না।”

বিচারক বলেন, “সম্পূর্ণ রায় না পড়ে কথা বলা উচিৎ না। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আদালতে না এসে, কখনও অ্যাপিয়ার না করে, একটা শব্দও উচ্চারণ না করে মিডিয়ার সামনে কথা বলে।”

তিনি বলেন, একটি রায়ের পর কেউ সন্তুষ্ট হতে পারেন, আবার কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হতে পারেস। আবার দুই পক্ষই অসন্তুষ্ট হতে পারে। এটা স্বাভাবিকভাবে নিতে হবে।

“যারা জ্ঞানি, বুদ্ধিজীবী, তাদের আইনানুগ কথা বলা উচিৎ। যখন বুদ্ধিজীবীরা, জ্ঞানীরা আইনানুগ কথা না বলেন, তখন আমাদের কষ্ট হয়। রায়ে কারও দুঃখ থাকলে আপিল বিভাগ আছে। যদি সমালোচনা করেন তবে আইনের মধ্যে থেকে করেন।”
সংবাদসূত্র: বিডিনিউজ।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.