Sylhet Today 24 PRINT

আফগান ফেরত যোদ্ধা থেকে ভয়ঙ্কর জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১৩ এপ্রিল, ২০১৭

ভয়ঙ্কর এক জঙ্গি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। বুধবার রাতে দুই সহযোগীসহ মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জঙ্গি নেতার জীবনাবসান হলো।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশে হওয়া জঙ্গি হামলাগুলোর বেশিরভাগের সাথেই জড়িয়ে আছে মুফতি হান্নানের নাম। মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩টি জঙ্গি হামলা চালান, যাতে ১০১ জন নিহত এবং ৬০০ মানুষ আহত হন। এসব ঘটনায় মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে মোট ১৭টি মামলা দায়ের করা হয়।

বাদ যাননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তাকেও একাধিকবার হত্যা চেষ্টা করেছে মুফতি হান্নান। শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড ছোঁড়া হয়েছে।

আফগানফেরত যেসব মুজাহিদ বাংলাদেশে জঙ্গি কর্মকাণ্ড শুরু করেছিল, তাদের একজন হান্নান। ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর সমাবেশে বোমা হামলা, ২০০১ সালে পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা এবং ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলায়ও তিনি জড়িত ছিলেন বলে তদন্ত উঠে এসেছে।

এছাড়া ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে সমাবেশে বোমা হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়াসহ পাঁচজনকে হত্যা এবং তার আগের বছর সিলেটের তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর গ্রেনেড হামলার পিছনেও তার হাত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া উপজেলার হিরণ গ্রামের স্বাধীনতাবিরোধী নূর উদ্দিন মুন্সির ছেলে হান্নান দক্ষিণ হিরণ মাদরাসায় পড়াশোনার মধ্য দিয়ে শিক্ষা জীবনের শুরু করেন। এরপর টুঙ্গিপাড়ার গওহরডাঙ্গা এবং বরিশালের শর্ষিনা মাদরাসায় লেখাপড়া করেন। পরে তিনি ভারতের বিহারের দেওবন্দ মাদরাসা এবং পাকিস্তানের করাচির নিউ টাউন মাদরাসায় লেখাপড়া করেন।

মুফতি হান্নানের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, দেওবন্দে দাওরায়ে হাদিস পড়াকালে ১৯৮৭ সালে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় স্নাতকোত্তর পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানে গিয়ে করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নুরিয়া মাদরাসায় ফিকাহশাস্ত্রে ভর্তি হন৷ সেখান থেকে সীমান্তবর্তী শহর খোস্তে মুজাহিদ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন তিনি। ওই যুদ্ধে আহত হয়ে পাকিস্তানের একটি হাসপাতালে ১০ মাস চিকিৎসা নেন।

এরপর মাদরাসার লেখাপড়া শেষ করে ১৯৯৩ সালের দিকে দেশে ফিরে হান্নান ব্যবসা শুরু করেন বলে এলাকাবাসী ও তার স্বজনরা জানান। গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্প নগরীতে ‘সোনার বাংলা সাবান ফ্যাক্টরি’ গড়ে তোলেন। পাশাপাশি কোটালিপাড়ার ঘাঘরকান্দা গ্রামে একটি ক্যাডেট মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

ওই সময় পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদীনের হয়ে তৎপরতা শুরু করেন হান্নান। তার আফগানফেরত মুজাহিদদের গড়ে তোলা হুজি-বি তে যোগ দিয়ে কোটালিপাড়া উপজেলা শাখার প্রচার সম্পাদক হন তিনি। ঘাঘরকান্দা গ্রামের ক্যাডেট মাদরাসায় চলতে থাকে তার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড।

বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে কার্যক্রম শুরু করে হুজি। সেসময় থেকে আফগানফেরত মুজাহিদরা মিলে হুজির নামে সংগঠনের ব্যানারে তৎপরতা শুরু করে। ১৯৯৪ সালের দিকে মুফতি হান্নান হুজি-বিতে যোগ দেয়। প্রথমে কোটালিপাড়া উপজেলার থানা প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পায় সে। সাংগঠনিক দক্ষতা থাকায় হুজি-বির নেতৃত্বে আসতে তার খুব বেশি সময় লাগেনি।

অল্প দিনেই হুজি-বির শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসে হান্নান। হুজিতে থাকার পাশাপাশি মুফতি হান্নান হরকাতুল মুজাহিদীনের হয়েও কার্যক্রম চালাত।

এরপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশে সংগঠনটিকে আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা শুরু করে হান্নান। সমন্বয় সাধন করে জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিতে হান্নান বলে, দেশে অনৈসলামিক কাজ বন্ধ করার জন্য মৌখিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড সুপার মার্কেট হতে ভেতরের দিকে একটি রোডে আমাদের অফিসে ৪-৫ জন মিলে একটি আলোচনা সভা হয়। সেখানে মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির, বাগেরহাটের মাওলানা আবু মুসা, হাফেজ জাহাঙ্গীর বদর, হাফেজ ইয়াহিয়া, মাওলানা আবু বকরসহ আরও ২-১ জন উপস্থিত ছিলো। সভার সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশে উদীচীর উলঙ্গ গান-বাজনা বন্ধ করা হবে। সেদিনই মাগরিবের পর মুগদা অফিসে আমীর মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, সাইদুর রহমানকে পেয়ে সেখানে উদীচীর গান-বাজনা বন্ধের বিষয়ে আলোচনা করি।

জবানবন্দিতে হান্নান আরও বলে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। এরপর দেশের প্রখ্যাত আলেমরা ইসলামী আইনানুযায়ী দেশে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার বাইরে দেশের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে ফতোয়া দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করেন। তাতে আওয়ামী লীগ সরকার বাধা দেয়। তারা ফতোয়ার বিরুদ্ধে হাইকোর্ট মামলা করলে আদালত ফতোয়া দেয়া অবৈধ ঘোষণা করেন যাতে আলেম-ওলামাদের ফতোয়া দেয়া বন্ধ হয়ে যায়।

এভাবেই সংগঠনের নেতা কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে করে বিভিন্ন হামলার পরিকল্পনা করতো মুফতি হান্নান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনাও করে সে। সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেই সিদ্ধান্ত হয় ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার।

একের পর এক জঙ্গি হামলা
১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে এদেশে গোপন জঙ্গি সংগঠন হুজি-বির নাশকতা শুরু হয়। হুজি-বির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সিদ্ধান্তে মুফতি হান্নান ও মুফতি আবদুর রউফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এ হামলা হয় বলে হান্নানের জবানবন্দিতে উল্লেখ আছে। ওই হামলায় ১০ জন নিহত ও দেড়শ জন আহত হন।

এরপর একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। তাতে নিহত হন আটজন।

২০০০ সালের জুলাইয়ে কোটালিপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছাকাছি ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে আলোচনায় আসে মুফতি হান্নান ও তার দল। এরপর থেকে আত্মগোপনে থেকে তৎপরতা চালাতে থাকে মুফতি হান্নান।

২০০১ সালে ঢাকায় সিপিবির সমাবেশে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানসহ ছয়টি বোমা হামলার ঘটনা ঘটায় জঙ্গিরা।

২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে বাংলাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর এবং ৭ আগস্ট সিলেটের তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর গ্রেনেড হামলা চালায় হুজি-বির জঙ্গিরা।

এরপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায় মুফতি হান্নানের দল। এতে আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ শতাধিক ব্যক্তি।

মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে। এক সমাবেশে চালানো ওই হামলায় আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত হন।

২০০৫ সালে হুজি-বি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

২০০৪ সালে সিলেটে শাহজালালের মাজারে তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলায় তিনজন নিহতের ঘটনায় বুধবার দুই সহযোগীসহ ফাঁসিতে ঝুললেন তিনি। রমনায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায়ও ফাঁসির আদেশ হয়েছে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) এই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.