সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৭ এপ্রিল, ২০১৭
দেশে চিকিৎসাসেবা নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থার অভাব থাকায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চিকিৎসাসেবা নিতে ঝুঁকছে বাংলাদেশিরা। সম্প্রতি ভারতে এক সমীক্ষায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে। বিদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রতি তিন জন রোগীর মধ্যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক।
‘ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ কমার্শিয়াল ইন্টেলিজেন্স এন্ড স্যাটিসটিক্যাল’-এর পক্ষে থেকে দেওয়া একটি রিপোর্টে দেখা গেছে ২০১৫-১৬ সালে ভারতে স্বাস্থ্যসেবা নেয়া বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে শীর্ষে ছিলেন বাংলাদেশিরা। ভারতীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অন্য দেশ থেকে যাওয়া ৪ লাখ ৬০ হাজার রোগীর মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজারেরও বেশি গিয়েছেন বাংলাদেশ থেকে। অর্থাৎ প্রতি চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রতি তিন জনে একজন বাংলাদেশি।
ভারতে চিকিৎসা করানোর জন্য ২০১৫-১৬ সালে মোট ৫৮,৩৬০ জন বাংলাদেশি নাগরিককে মেডিকেল ভিসা দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৩৪৩.৫৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের চিকিৎসা পরিসেবা নিয়েছে এই রোগীরা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রোগীদেরকে এই পরিসেবা দেওয়া হয়েছে ১১১.৩৭ মিলিয়ন ডলারের।
এদিকে, ২০১৬ সাল থেকে ভারতে যাওয়া বিদেশি পর্যটকের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করা যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে সেই জায়গা দখল করেছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ। এর মধ্যে বেশিরভাগই হল চিকিৎসা পরিসেবা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিক।
এর কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থার অভাব রয়েছে। অভিযোগ আছে অতিরিক্ত ব্যয়েরও। এসব কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
এ ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ দুই দেশের মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রটি আরও সহজতর হওয়া। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে কানেকটিভিটি বাড়াতে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের গোড়াতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরেই কলকাতা-ঢাকা বাস সার্ভিস চালু করার পাশাপাশি কলকাতা-খুলনা ট্রেন সার্ভিসের উদ্বোধন হয়।
মেডিকেল ট্যুরিজম থেকে ভারতের আয়েরও সিংহভাগ অর্থাৎ ৫০ শতাংশই যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। ডিজিসিআইঅ্যান্ডএসের হিসাবে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর মেডিকেল ট্যুরিজম থেকে দেশটি আয় করেছে মোট ৮৮ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই গেছে ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১ কোটি ১৩ লাখ ও ইরাক থেকে ৫ কোটি ডলার আয় করেছে দেশটি।
ভারতে রোগীপ্রতি ব্যয়েও ওপরের দিকে রয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ভারতে চিকিৎসা গ্রহণে বাংলাদেশী রোগীদের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ব্যয় হয়েছে গড়ে ২ হাজার ৮৪ ডলার। এর চেয়ে বেশি ২ হাজার ৯০৬ ডলার ব্যয় করেছে পাকিস্তানিরা।
ভারতে বিদেশী পর্যটকের উৎস দেশ হিসেবেও বাংলাদেশ এখন শীর্ষে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে ১৩ লাখ ৭০ হাজার পর্যটক, ২০১৫ সালের চেয়ে যা ২১ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ থেকে পর্যটক বৃদ্ধির পেছনেও রয়েছে দেশটিতে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ।
বাংলাদেশের পরই ২০১৫-১৬ সালে সবচেয়ে মেডিকেল ভিসা দেওয়া হয়েছিল আফগানিস্তানকে। চিকিৎসা করাতে মোট ২৯,৪০০ জন আফগান নাগরিক ভারতে যান। এর ঠিক পরেই রয়েছে ইরাক (৯১৩৯ রোগী), নাইজেরিয়া (৫৯৯৪ রোগী), কেনিয়া (৩২৪০ রোগী)। ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছে পাকিস্তানিরা। মেডিকেল ভিসা নিয়ে ভারতে যাওয়া ১৯২১ জন পাক নাগরিকের মাথা পিছু খরচ হয়েছে ২৯০৬ ইউএস ডলার। যা সমগ্র বিদেশি রোগীদের থেকে প্রাপ্ত আয়ের ১.৩৫ শতাংশের মতো। রিপোর্টে দেখা গেছে মূলত অর্থপেডিক, কার্ডিওলজি এবং নিউরোলজি-এই তিনটি সমস্যা নিয়েই ভারতে চিকিৎসা নিতে যান বিদেশি রোগীরা।
এদিকে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশী নাগরিকদের আকৃষ্ট করতে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া আরো সহজ করেছে দেশটি। রোগ নির্ণয়ের জন্য ভারত ভ্রমণকারী বাংলাদেশী নাগরিকরাও চিকিৎসা ভিসার জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হবে।
১৭ এপ্রিল (সোমবার) '১৭ এক বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন জানায়, দুই দেশের মানুষে-মানুষে বন্ধন আরো জোরালো করার পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য চিকিৎসা ভিসা প্রদানের নিয়মাবলী শিথিল করা হয়েছে। চিকিৎসা ভিসার জন্য আবেদনপত্রের সঙ্গে যেকোনো স্বীকৃত ভারতীয় হাসপাতাল অনুমোদিত সাক্ষাতের প্রমাণপত্র ও রোগের বিষয়ে আলোকপাত করে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়পত্র অবশ্যই সংযুক্ত করতে হবে। চিকিৎসা ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে অন্যান্য নিয়ম-কানুন ও শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে। বর্তমানে চিকিৎসা ভিসার জন্য আবেদনপত্রগুলো গুলশান, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সব ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে সরাসরি গ্রহণ করা হচ্ছে।