Sylhet Today 24 PRINT

সরকারের সাথে ‘সখ্যতায়’ হেফাজতের তাণ্ডবের বিচার নিয়ে সংশয়

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০৫ মে, ২০১৭

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীতে নজিরবিহীন তান্ডব চালিয়েছিলো হেফাজতে ইসলাম। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের তাণ্ডবের ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা ৫৩ মামলার ৪৯টিরই তদন্ত শেষ হয়নি। চারটি মামলার চার্জশিট দেওয়ার পর ঢিমে গতিতে বিচারকাজ চলছে, যেগুলোতে অভিযুক্তের তালিকায় উল্লেখযোগ্য কেউ নেই।

সম্প্রতি হেফাজতের সাথে সরকারের সখ্যতা ও মামলাগুলোর অগ্রগতি না হওয়ায় সেদিনের তাণ্ডবের আদৌ বিচার হবে কী না এ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। ৫ মের ঘটনায় হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো এখন অনেকটাই হিমাগারে রয়েছে।

ঘটনার পরে যে ৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাদের প্রায় সবাই জামিনে মুক্ত। অনেকে বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন, কয়েকজন টেলিভিশনে টক শোতেও অংশ নিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, সরকারের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের একধরনের সমঝোতা স্থাপিত হয়েছে। এর প্রমাণ কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর মর্যাদা দিয়ে স্বীকৃতি প্রদান। সম্প্রতি মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে যে ব্যাপক সংশোধন করা হয়েছে, তাতে হেফাজতের নেতারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিকভাবে কোনো সমঝোতার কথা সরকারের মন্ত্রী-নেতারা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তবে হেফাজতের প্রতি সরকারের নরম নীতির প্রভাব পড়ছে মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। ভবিষ্যতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সবুজ সংকেত মিললে হয়ত মামলার তদন্তের ফাইলও দ্রুত নড়াচড়া করতে পারে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, হেফাজতের তাণ্ডবের যেসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছিল, সেগুলোতে মাঠপর্যায়ে কার কী ভূমিকা ছিল, তাদের পরিচয় কী- সে সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়ায় মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি।

তদন্তাধীন মামলার মধ্যে উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহজাহান হত্যা ও ট্রাফিক পুলিশ বক্সে আগুন দিয়ে পুলিশের এক সদস্যকে হত্যাচেষ্টার মামলা রয়েছে। এসআই শাহজাহান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের নাম এসেছে। কাদের নির্দেশে ওই হত্যাকা হয়, তাদের নাম এসেছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে কারা ছিল, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিসি (দক্ষিণ) মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা 'মঞ্চ' হিসেবে সামনে আসে হেফাজতে ইসলাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের 'নাস্তিক' আখ্যা দিয়ে তাদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে মাঠে নামে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক চট্টগ্রামের হাটহাজারীকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। ওই বছরের ৬ এপ্রিল তারা ঢাকামুখী লংমার্চ কর্মসূচি দেয়। ৫ মে ঢাকা ঘেরাও এবং মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচিতে মতিঝিল-পল্টন ও আশপাশের এলাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, যানবাহন, ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর ও অগি্নসংযোগ করা হয়। কেটে ফেলা হয় অনেক গাছ। বায়তুল মোকাররমে কোরআন শরিফে আগুন দেওয়া হয়। তাদের নৃশংস হামলা থেকে রক্ষা পাননি ফুটপাতের শত শত দোকানিও। তবে ওই এলাকায় জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন রয়েছে এমন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়নি। ৫ মে গভীর রাতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ অভিযানের মুখে মতিঝিল ছাড়তে বাধ্য হয় হেফাজতের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা।

পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ওইসব তাণ্ডব ও সহিংস ঘটনায় রমনা থানায় ৯টি, মতিঝিল থানায় ৪০টি, ওয়ারীতে ৩টি ও তেজগাঁওয়ে একটি মামলা করা হয়। এগুলোর মধ্যে ১৫টি মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বাকিগুলোর তদন্ত করছে থানা পুলিশ।

শাপলা চত্বরের সমাবেশ ভাঙার পর হেফাজতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল তাদের আড়াই হাজার কর্মী ও সমর্থক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকেও একই সুরে কথা বলা হয়। বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন 'অধিকার' দাবি করে, তাদের কাছে নিহত ৬১ জনের তালিকা রয়েছে। তবে তারা নাম প্রকাশ করেনি। পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে, হেফাজত ও অধিকারের তথ্য সঠিক নয়। পুলিশ জানিয়েছিল, হেফাজতের সঙ্গে সংঘর্ষে রাজধানীতে একজন পুলিশ সদস্যসহ ১৩ জন নিহত হয়েছেন। মিথ্যা তথ্য দিয়ে উস্কানি সৃষ্টির চেষ্টা করায় ওই বছর ১০ আগস্ট অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান শুভ্রকে গ্রেপ্তার করা হয় ও 'নিহতদের' তালিকার জন্য তার কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হয়। তালিকার বিষয়টি পরে ভুয়া প্রমাণিত হয়। সরকারের তরফে অনেকবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও হেফাজত নেতারা আজও কোনো 'শহীদের' নাম প্রকাশ করেননি। ক্রমে তারা এ বিষয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেন।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, হেফাজতের তাণ্ডবের পর কিছুদিন এসব মামলার তদন্ত নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল। হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী, সাবেক এমপি মুফতি ওয়াক্কাস, মুফতি মমিনুল, মুফতি হারুনসহ ৭৮ জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। হেফাজতের মঞ্চ থেকে নানা ধরনের নির্দেশনা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মুফতি ওয়াক্কাস। ওই নাশকতায় জামায়াত, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলনসহ বেশ কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ইন্ধনের বিষয়টি গোয়েন্দারা জানতে পারে।

হেফাজতের তাণ্ডবের দিন এসআই শাহজাহান হত্যা মামলায় বিএনপির শীর্ষ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার ও রফিকুল ইসলাম মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এখন সব মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামিরা প্রকাশ্যে থাকলেও তারা ধরা-ছোঁয়ার ঊর্ধে।

সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ধারায় হেফাজত নেতারা সরকারের কাছ থেকে অনেক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে ১৩ দফা দাবির ব্যাপারে হেফাজত নেতারা আর উচ্চকণ্ঠ থাকেন না। তবে কওমি মাদ্রাসার সনদ, সুপ্রিম কোর্ট ভবনের সামনে থেকে ভাস্কর্য অপসারণের দাবি প্রভৃতিতে চাপ বাড়িয়ে এখন আবার হুমকির ভাষায় বক্তৃতা করছেন তারা।

তদন্ত না এগোনো ২০১৩ সালের মামলাগুলোর এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা মাইনুদ্দীন রুহী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা ফরিদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম, নায়েবে আমির মহিবুল্লাহ বাবু, তাজুল ইসলাম, আবুল মালেক হালিম, আজিজুল হক ইসলামাবাদী, ফজলুল হক জিহাদী, নেজামে ইসলামের সাহিত্য সম্পাদক মুফতি হারুন ইজাহার, হেফাজতে ইসলামের অর্থ সম্পাদক মাওলানা ইলিয়াছ ওসমানী, নূর হোসেন কাসেমী, মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মাহফুজুল হক, আবদুল কুদ্দুস, নুরুল ইসলাম, আবুল হাসনাত আমিনী, মোস্তফা আজাদ, মুফতি নুরুল আমিন, শাখাওয়াত হোসেন, আতাউল্লাহ আমিন, গোলাম মহিউদ্দিন একরাম, শেখ লোকমান হোসেন, মুফতি শায়দুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম মাদানী, শামসুল হক, মনির হোসেন মুন্সী, আবদুল কাদের প্রমুখ। রাজধানীসহ সারাদেশে হেফাজতের তা বের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় লক্ষাধিক অজ্ঞাতনামা নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছিল।

সূত্র : সমকাল

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.