Sylhet Today 24 PRINT

ভ্যাট-ভোটে ভোটের জয়

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ২৯ জুন, ২০১৭

সকল পণ্য বিক্রির উপর অভিন্ন হারে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নিতে ২০১২ সালের করা আইনটি ২০১৬ সালের ১ জুলাই তা কার্যকরের পরিকল্পনা আপাত থেমে গেছে, নতুন আইনটি আগামী দুই বছর কার্যকর হবে না, অর্থাৎ নির্বাচনের পর কার্যকর হবে। ২০১২ সালে করা আইন ব্যবসায়ীদের বিরোধিতার মুখে কার্যকর সম্ভব না হওয়ায় এবার থেকে কার্যকরের পরিকল্পনা ছিল। তবে এবারও তা কার্যকর হচ্ছে না, কার্যকর হবে ভোটের পর।

এ সময় পর্যন্ত পুরোনো ভ্যাট আইন বহাল থাকবে। অর্থাৎ এত দিন ধরে যেভাবে চলছিল, সেভাবেই চলবে।

বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী এসব পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। এর আগে জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনা কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আইনটা খুব ভালো। এটা নিয়ে যেহেতু নানা কথা উঠেছে, ব্যবসায়ীরা তেমন একটা সাড়া দিচ্ছেন না। এটা নিয়ে যেহেতু নানা ধরনের কথা হচ্ছে, তাই এটা আগের পর্যায়ে অর্থাৎ যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকবে। আগামী দুই বছর এ ভ্যাট আইন পুরোপুরি কার্যকর না করে যেভাবে আছে, সেভাবে যাতে ভ্যাট আদায় হয় সেটাই বজায় রাখবেন—সবার পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

ভ্যাট আইনের বিরোধিতায় যেসব সংসদ সদস্যরা সরব ছিলেন, তাদের সামনে এই আইন প্রণয়নের ইতিহাসও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মূসক আইনটি ১৯৯১ সালে করা, ২০০৮ সালে সংশোধনের জন্য খসড়া তৈরি হয়। সবার সঙ্গে মতবিনিময় করেই আইনটি আমরা করে দিই ২০১২ সালে। এখন সবাই ভুলেই গেছে যে আইনটি আমরা পাস করে দিয়েছিলাম।”

উন্নয়নের জন্য কর বাড়ানোর উপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভ্যাট-ট্যাক্স যাই দিচ্ছি, সব তো দেশের উন্নয়নের কাজেই লাগবে। তা যদি না দিই, তাহলে তো ভিক্ষা চাইতে হবে।”

এবার বিশাল বাজেটের খরচ মেটাতে দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা জনগণের কাছ থেকে কর ও শুল্ক হিসেবে আদায়ের পরিকল্পনা নেন মুহিত। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা আনার পরিকল্পনা দৃশ্যত বাধাগ্রস্ত হল।

এখন ব্যবসায়ীরা বিক্রির অনুপাতে ভ্যাট দিচ্ছেন না, যা নতুন আইনে দিতে হবে। এখন তারা বাৎসরিক নির্দিষ্ট একটি অঙ্ক ভ্যাট হিসেবে দিচ্ছেন। নতুন আইনে ভ্যাটের হিসাব বের করা ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের জন্য দুষ্কর হবে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দাবি করে আসছিল।

ভোক্তা সংগঠন ক্যাব বলছিল, ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে গেলে বাজারে পণ্যমূল্য বাড়বে এবং তাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্রেতারা।

অর্থমন্ত্রী ২০১৬ সালে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েও তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে এই আইন ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া ছিল। কিন্তু বছরজুড়েই ব্যবসায়ীরা প্রবলভাবে এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। এমনকি বাজেটের আগে পরামর্শক কমিটির বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ নিয়ে ব্যবসায়ী ও এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকির ঘটনাও ঘটে। তারপরও নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েই বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থগিতই রাখতে হলো নতুন ভ্যাট আইন।

এছাড়াও ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্কের হারও কমেছে। বর্ধিত হারের আবগারি শুল্ক প্রস্তাবের পর প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। দলীয় সাংসদ ও কয়েকজন মন্ত্রীও এ সমালোচনায় যোগ দেন।

গত ১ জুন ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার যে বাজেট সংসদে প্রস্তাব করা হয়েছিল, তাতে ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্কহার বাড়ানো হয়। তাতে বলা হয়, বছরের যে কোনো সময় ব্যাংক হিসাবে এক লাখ টাকার বেশি স্থিতি থাকলে আবগারি শুল্ক বিদ্যমান ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা দিতে হবে।

১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত স্থিতির ক্ষেত্রে ১ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত স্থিতির ক্ষেত্রে ৭ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার বেশি স্থিতিতে ১৫ হাজার টাকার বদলে ২৫ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক আদায়ের প্রস্তাবও করেন মুহিত।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতে কোনো আবগারি শুল্ক না রাখতেই বলেন। ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত তিনটি স্তর প্রস্তাব করেন তিনি। শেখ হাসিনা ১ লাখ ১ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতে ১৫০ টাকা এবং ৫ লাখ ১ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতে ৫০০ টাকা আবগারি শুল্ক কাটার প্রস্তাব করেন।

১ কোটি টাকার উপর অন্য স্তরের ক্ষেত্রে শুল্ক হার মুহিতের প্রস্তাব মতোই থাকছে।

বাজেট উপস্থাপনের পরপরই ভ্যাট আইনের সঙ্গে আবগারি শুল্ক নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। বাজেট ঘোষণার পরদিন সংবাদ সম্মেলনে মুহিতের বক্তব্যে সমালোচনার মাত্রা আরও বাড়ে।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের পর অর্থমন্ত্রী সংশোধিত আকারে আবগারি শুল্কের হার প্রস্তাব করেন, যা কণ্ঠভোটে পাস হয়। আবগারি শুল্কের নতুন হার হলো- আবগারি শুল্কহার ২০১৭-১৮ রয়েছে, ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ০; ১ লাখ+ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫০ টাকা; ৫ লাখ+ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫০০ টাকা; ১০ লাখ+ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ২৫০০ টাকা; ১ কোটি+ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ১২০০০ টাকা; ৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে ২৫০০০ টাকা।

ধ্যান বা যোগের (মেডিটেশন) ওপর আগামী দুই বছর কোনো ভ্যাট নেই। অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে একটি সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করব। এ ছাড়া কম্পিউটার, মুঠোফোন এবং এর যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি হলে তা ভ্যাটমুক্ত থাকবে। স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদিত হলে তাতেও ভ্যাট বসবে না।’

মাইক্রোসফট বাংলাদেশ লিমিটেড যেসব পণ্য বিনা আমদানি শুল্কে আমদানি করে; সেসব পণ্যের ওপর ভ্যাট থাকবে না। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার আমদানি করে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক প্রদান করে থাকে।

এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে অর্থমন্ত্রী প্লাস্টিক ও গ্লাস ফাইবারে তৈরি এলপিজি কনটেইনারের আমদানি পর্যায়ে কোনো ভ্যাট রাখেননি।

সোলার প্যানেলের ওপর ১০ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক বসানোর প্রস্তাব করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী সেই প্রস্তাব তুলে নিয়েছেন। এর ফলে সোলার প্যানেল আমদানিতে কোনো আমদানি শুল্ক দিতে হবে না।

রেফ্রিজারেটর সংযোজনকারীরা নতুন করে সুবিধা পাবেন। তাঁদের ওপর আরোপিত ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এ দেশে মোটরসাইকেলের যন্ত্রপাতি উৎপাদনে উৎসাহিত করার জন্য কিছু শুল্ক কর রেয়াত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় প্রস্তাবিত বাজেটে তা বাতিল করা হয়েছিল। এ খাতের ব্যবসায়ীরা শিগগিরই উৎপাদনে যাবেন—এমন আশ্বাস দেওয়ায় অর্থমন্ত্রী শুল্ক কর সুবিধাগুলো আগের মতোই বহাল রেখেছেন।

জাপানের হোন্ডার মতো প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেল ও গাড়ি উৎপাদন করতে চাইলে প্রয়োজনীয় উপকরণের আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কর কম দিতে হবে। অর্থমন্ত্রী বক্তৃতায় বলেছেন, জাপান দূতাবাস ও নিটল–নিলয় কোম্পানি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে হোন্ডা ও অন্যান্য কোম্পানি মোটরসাইকেল ও গাড়ি উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করবে।

তৈরি পোশাক তৈরি পোশাক খাতে উৎসে কর ১ শতাংশ বহাল থাকবে। তবে করপোরেট করের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সবুজ কারখানা হলে ১০ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সবুজ কারখানার জন্য ১৪ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ করপোরেট করের প্রস্তাব করা হয়েছিল। চলতি অর্থবছর পর্যন্ত উৎসে কর দশমিক ৭ শতাংশ এবং করপোরেট কর ২০ শতাংশ আছে।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের নৌযান, বার্জ, ট্যাংকার ইত্যাদির আয়করবিষয়ক প্রজ্ঞাপন সংশোধন করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.