Sylhet Today 24 PRINT

আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহবান কূটনীতিকদের

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক রাখাইন রাজ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানিকে গণহত্যা বলছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। রোববার বিকেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা এ অভিমত দিয়েছেন বলে ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, তুরস্ক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শরণার্থী সংস্থা এবং ওআইসিভুক্ত আরব দেশের ঢাকাস্থ কূটনীতিকরা কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটে রাজনৈতিক ও মানবিক উভয়ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কূটনীতিকরা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ব্রিফিংয়ে জানান, রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিতে কক্সবাজারে একটি এলাকার গাছ কেটে সে এলাকা আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পররাষ্ট্র প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, তুরস্ক এবং পরে ওআইসিভুক্ত আরব দেশের কূটনীতিকদের ব্রিফ করেন। কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মান, ইতালি, তুরস্ক, রাশিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এবং ঢাকাস্থ জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি, জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার ঢাকাস্থ প্রতিনিধি, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার প্রতিনিধি, ইউনিসেফ, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ও রেডক্রসের প্রতিনিধিরা। ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মিসর, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, মরক্কো, ওমান, ফিলিস্তিন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ও চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স উপস্থিত ছিলেন।

ব্রিফিং শেষে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রধান শিনজি কুবো সাংবাদিকদের বলেন, গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বলে তথ্য এসেছে। তাদের মানবিক সহায়তার জন্য ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কমপক্ষে প্রয়োজন হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে মিয়ানমারের ভেতরে সেফ জোন প্রতিষ্ঠা নয়, বরং রাখাইনেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদে বাস করার পরিবেশ সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অন্য কোনও দেশে আশ্রয়ের ব্যবস্থার চেয়ে কক্সবাজারেই তাদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জোয়েল রাইফম্যান সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাষ্ট্র রাখাইন রাজ্যের সংঘাত নিরসনে স্থায়ী সমাধান হিসেবে কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের সুপারিশের বাস্তবায়ন চায়। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রস্তাব গ্রহণসহ মিয়ানমারের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা র্পৌছে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

ভ্যাটিকান সিটির ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত আর্চবিশপ জর্জ কোচেরি সাংবাদিকদের জানান, রাখাইন রাজ্যে প্রায় তিন হাজার সাধারণ নাগরিক সে দেশের সামরিক বাহিনীর অভিযান চলাকালে নিহত হয়েছেন বলে জেনেছেন। তিনি বলেন,পোপ ফ্রান্সিস রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

কূটনীতিকদের ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, কূটনীতিকদের রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিস্থিতির সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নতুন করে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা গত ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিদেশি কূটনীতিকরা রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের সমাধানে রাজনৈতিক ও মানবিক সহায়তাসহ বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা রোহিঙ্গা জনগণের পাশে আছে,রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে আছেন। কূটনীতিকরা রাখাইনে গণহত্যা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি কঠোর ভাষায় আহ্বান জানিয়েছেন। সংকটের সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নকেই সমাধানের পথ হিসেবে বিবেচনা করে তা বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির নিয়োগ করা আনান কমিশন রোহিঙ্গাদের পূর্ব নাগরিকত্ব প্রদান ও রাখাইনে উন্নয়নের সুপারিশ করেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ছে, এটাও এখন স্পষ্ট। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে রাখাইন পরিস্থিতিতে যেসব বিবৃতি আসছে,তা বাংলাদেশে এবং রোহিঙ্গাদের পক্ষে। মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই চাপ অনুভব করছে কি-না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের শীর্ষ পর্যায়ের দু’জন ব্যক্তি গত দু’দিনে বলেছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া যাদের মিয়ানমারের নাগরিক বলা হচ্ছে, তাদের কাছে মিয়ানমারের নাগরিকত্বের প্রমাণ থাকলে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক চাপ অনুভব করছে বলেই তারা এখন এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যারা রাখাইন থেকে পালিয়ে এসেছে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা সবকিছু হারিয়ে কোনোরকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসছেন। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে কোনও প্রমাণ নিয়ে আসা সম্ভব নয়। ফলে মিয়ানমারের এ ধরনের বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য নয়। মিয়ানমারের নাগরিক যারা পালিয়ে এসেছে তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে এবং মিয়ানমারের ভূখণ্ডের ভেতরেই তাদের বসবাসের নিরাপত্তা দিতে হবে, এটাই সংকট নিরসনের পথ এবং এ লক্ষ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ভারতীয় অঞ্চল, আরব অঞ্চল, মধ্য এশিয়া এবং পর্তুগিজরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনে আরাকানে এসেছিল। তারাই পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গা নৃগোষ্ঠী নামে পরিচিত হয়েছে। মিয়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উ নু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মতোই নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। রোহিঙ্গারা ২০১০ সালের আগেও সে দেশের নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, এমপি এমনকি মন্ত্রী হয়েছে। এখন তাদের মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। অধিবেশন শুরু হলেই এ তৎপরতার ফল দৃশ্যমান হবে। তিনি বলেন, কূটনৈতিক তৎপরতার আগে কিছুই সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করা যায় না। এটা ক্রমেই প্রকাশ্য।

তিনি আরও বলেন, টকশোতে অনেকের বক্তব্য শুনে মনে হয়, বাংলাদেশকে এখনই মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। এটা কোনও যৌক্তিক কথা নয়। বাংলাদেশ শান্তির পথে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধানে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, এশিয়ায় আঞ্চলিকভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বহুপক্ষীয় কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অব্যাহত কূটনৈতিক তৎপরতার কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের রক্ষা ও শরণার্থী সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.