সিলেটটুডে ডেস্ক | ২২ অক্টোবর, ২০১৭
রাজধানীর চামেলীবাগের বাসায় পুলিশ কর্মকর্তা বাবা মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমানকে হত্যার মামলায় তাঁদের মেয়ে ঐশী রহমানকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।
রোববার (২২ অক্টোবর) ৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিমকোর্টের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ে যে পাঁচ কারণে ঐশীর সাজা কমানো হয়েছে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
গত ৫ জুন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের বেঞ্চ ঐশীর সাজা কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে দণ্ড কমানোর ব্যাখ্যায় আদালত বলেন, পাঁচটি কারণে ঐশীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে। এগুলো হলো :
১. হত্যাকাণ্ডের সময় ঐশী মাদকাসক্ত ছিলেন এবং ১৪ বছর বয়স থেকেই তিনি সিসা, ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের মতো নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করতেন।
২. ঐশী বংশগতভাবে মানসিক রোগী। তাঁর চাচা-দাদি-খালা অনেকের মধ্যেই মানসিক রোগের লক্ষণ আছে, যা তাঁর মধ্যেও ছোটবেলা থেকে বিদ্যমান।
৩. হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দ্বিতীয় দিনের মাথায় ঐশী আত্মসমর্পণ করেছেন। এতে বোঝা যায়, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
৪. ঘটনার সময় ঐশীর বয়স ছিল ১৯ বছর। এ বয়সের একটি সন্তানকে তাঁর বাবা-মা যথাযথভাবে দেখভাল করেননি। ফলে ঐশী ছোটবেলা থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন।
৫. ঐশীর বাবা-মা দুজনেই সন্তানের লালনপালন বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। এ কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি স্নেহবঞ্চিত হয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেন।
নিম্ন আদালত থেকে পাঠানো ডেথ রেফারেন্স ও ঐশীর আপিলের ওপর শুনানি শেষে গত ৭ মে ‘যে কোনোদিন রায়’ দেওয়া হবে মর্মে মামলাটি অপেক্ষমাণ রাখে হাইকোর্ট। এরপর ৫ জুন রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ে আদালত বলেন, ঐশীর পিতা পুলিশবাহিনীতে ও মা ডেসটিনিতে চাকরিরত ছিলেন। জীবন জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
ঐশীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি। তারা যখন উপলব্ধি করছিলেন এ বিষয়টি ঠিক সেসময় তার জীবন আসক্তিতে উচ্ছন্নে চলে গেছে।
রায়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়, আমেরিকা,অস্ট্রেলিয়া,কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড কমানোর কোনও গাইডলাইন নেই। এমনকি তা বিলুপ্ত করার পরিবেশ আসেনি। শিক্ষার হার বেড়েছে। জনসংখ্যাও বেড়েছে। ফলে অপরাধের প্রবণতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড রহিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
এতে আরও বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নয়। এটা কার্যকর করলেই যে সমাজ থেকে অপরাধ দূর হয়ে যবে তা নয়। কম সাজাও অনেক সময় সমাজ থেকে অপরাধ কমাতে সুষ্পষ্ঠভাবে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভূমিকা রাখতে পারে বা সাহায্য করে।
মৃত্যুদণ্ড রহিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা রোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
রায়ে বলা হয়,তবে সন্তানদের জন্য বাবা-মা ও অভিভাবকই হলেন প্রাথমিক শিক্ষক। এ হিসেবে তাদের জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা ও সন্তানকে সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
এর আগে গত ১০ এপ্রিল বিচারকের খাসকামরায় এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ঐশী রহমানের বক্তব্য শোনেন দুই বিচারপতি।
কারাগার থেকে ঐশীকে হাইকোর্টে হাজির করার পর তার বক্তব্য শোনা হয়। আদালতে ঐশীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট আফজাল এইচ খান ও সুজিত চাটার্জী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জহিরুল হক জহির ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আতিকুল ইসলাম সেলিম।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মালিবাগের চামেলীবাগে নিজেদের বাসা থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (পলিটিক্যাল শাখা) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরদিন ঐশী গৃহকর্মী সুমীকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পণ করেন।