সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৩ নভেম্বর, ২০১৭
রংপুরের পাগলাপীর সলেয়াশাহ ঠাকুরপাড়া এলাকায় হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, অঘ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার মূল হোতা ও উস্কানিদাতাকে গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তাদের মধ্যে দুজন জামায়াত ও দুজন বিএনপি নেতা রয়েছেন উল্লেখ করে তদন্ত সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, এরইমধ্যে জামায়াতের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতার করা গেলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে। তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য সীমান্তেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
টিটু রায় নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ধর্ম নিয়ে কথিত অবমাননাকর পোস্টকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীরা শুক্রবার ঠাকুরপাড়ায় হিন্দুদের ১০টি ঘর পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় পুলিশ শনিবার রাতে আরও ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
সংশ্লিষ্ট বলছেন, ফেসবুকের পোস্ট নিয়ে একটি 'বিশেষ রাজনৈতিক দল' ফায়দা হাসিলের জন্য সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে খেপিয়ে তোলে। ধর্মীয় অবমাননার প্রতিবাদে ও টিটু রায়ের শাস্তির দাবিতে তারা মাইকিং করে খলেয়া, হরিদেবপুর, মমিনপুর ইউনিয়ন, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া উপজেলা থেকে ট্রাকে-ভ্যানে করে হাজার হাজার লোকজন নিয়ে আসে সলেয়াশাহ এলাকায়। জুমার নামাজের পর মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও রংপুর জেলা সভাপতি ইনামুল হক মাজেদি, খলেয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি ও সলেয়াশাহ জামে মসজিদের ঈমাম সিরাজুল ইসলাম, জামায়াত নেতা মোস্তাইন বিল্লাহ, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মাসুদ রানাসহ অন্যরা।
এর পরই ঠাকুরপাড়া এলাকায় হিন্দুদের বাড়িঘরে ব্যাপক ভাংচুর ও অঘ্নিসংযোগ করা হয়। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বাধে। এতে খলেয়া ইউনিয়ন জামায়াতের কর্মী হাবিব মিয়া মারা যান। তাদের পুরো পরিবারই জামায়াত সমর্থক। ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪০ জন। তাদের বেশিরভাগই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। পুলিশ চিকিৎসাধীন আহতদের নজরদারিতে রেখেছে। তাদের গ্রেফতার করা হতে পারে।
হামলা, অগ্নিসংযোগ, বিক্ষোভ, সংঘর্ষ সবকিছুর ভিডিও এখন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। তারা এসব দেখে গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছেন। গত দু'দিনে পুলিশ ১০২ জনকে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে শনিবার রাতে ৪৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে ৩৩ জনই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। এর আগে ৫৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, শনিবার ভোরে মূল হোতা ও উস্কানিদাতাদের একজন জামায়াত নেতা ও মসজিদের ইমাম সিরাজুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশকে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। জড়িতদের নামও বলেছেন। অন্য তিন হোতাকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ওই তিন হোতা প্রতিদিনই তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছেন। তাদের মোবাইলও বন্ধ রেখেছেন। তারা যাতে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী ভারতে যেতে না পারে সেজন্য সীমান্ত এলাকায় বিজিবিকে বাড়তি নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে।
সলেয়াশাহ এলাকার আরিফুর রহমান ও সেলিম মিয়া জানান, ঈমাম সিরাজুল ইসলাম মসজিদে বেশিরভাগ সময় উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে মুসল্লিদের হিন্দুদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। জামায়াতের একটি বড় ঘাঁটি হচ্ছে ওই এলাকা। তিন উপজেলা পাশাপাশি হওয়ায় বিশেষ সুবিধা হয় তাদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাতে অভিযান শুরু করলে তারা এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় খুব সহজেই পালিয়ে যেতে পারেন।
রংপুর কোতোয়ালী থানার ওসি (তদন্ত) আজিজুল ইসলাম বলেন, 'জিজ্ঞাসাবাদে জামায়াত নেতা ও ইমাম সিরাজুল ইসলামের দেওয়া তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।'
এদিকে, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, 'মূল হোতা ও ইন্ধনদাতাদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।'
তিনি আরও বলেন, 'ঘটনার সঙ্গে জামায়াত-শিবির জড়িত। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্যই তারা এসব করেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ থাকায় তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি।'