নিউজ ডেস্ক | ০৬ জুন, ২০১৫
নরেন্দ্র মোদির আগেই ঢাকা এসে পৌঁছেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মোদির সফর শুরু শনিবার সকাল থেকেই। থাকবেন ৩৬ঘন্টার মতো সময়; এ সময়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত হবে বেশ কয়েকটি চুক্তি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ সফরের মধ্য দিয়ে নতুন মাত্রা পাচ্ছে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক। আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তি হচ্ছে দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধের। ৪১ বছরের পুরনো দ্বিপক্ষীয় স্থলসীমান্ত চুক্তি ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভায় এরই মধ্যে অনুমোদন হয়েছে।
স্থলসীমানা চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও নরেন্দ্র মোদির এ সফরে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত কানেক্টিভিটি। এজন্য দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের কথা রয়েছে। এছাড়া সফরকালে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সহজ শর্তে ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণপ্রদানসহ আরো ১৫টি বিষয়ে চুক্তি ও প্রটোকল সই হবে।
জানা যায়, বাংলাদেশ-ভারত কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি হবে দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি। সংশোধিত নৌ-প্রটোকলের আওতায় তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য পাঠাতে উভয় দেশ পরস্পরকে নিজ নিজ নৌপথ ব্যবহারের অনুমতি দেবে। একটি সূত্র বলেছে, তৃতীয় দেশে পণ্য পরিবহনের বিষয়টি নিয়ে জটিলতা এখনো কাটেনি। তবে ট্রানজিট ফি পরিশোধপূর্বক উভয় দেশের পরস্পরের নৌপথ ব্যবহারের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত।
বাণিজ্য চুক্তি ও নৌ-প্রটোকলের আওতায় ভারতের কলকাতা থেকে নৌযানে আশুগঞ্জ বন্দর পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করা হবে। সেখান থেকে আখাউড়া হয়ে আগরতলা পর্যন্ত সড়ক বা রেলপথে পণ্য পরিবহন করবে ভারত। এজন্য আশুগঞ্জে আইসিডি প্রতিষ্ঠা এবং আখাউড়া-আগরতলা সড়ক নির্মাণে ঋণ দেবে ভারত সরকার।
এছাড়া কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে শিলং পর্যন্ত যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলের বিষয়টিও প্রটোকলে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। আর উপকূলীয় নৌ-চলাচল চুক্তির আওতায় দুই দেশের বন্দরের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করবে, বর্তমানে যা সিঙ্গাপুর হয়ে যাতায়াত করে।
কানেক্টিভিটির আওতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছে ভারত। এ সময়ে এ সংক্রান্ত ‘লেটার অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা রয়েছে। আর বন্দর থেকে ভারতের ভূখণ্ডে পণ্য পরিবহণে বাংলাদেশের সড়ক, নৌ ও রেলপথ অবকাঠামো উন্নয়নে বেশকিছু প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ত্রিপুরার সাবরুমের সঙ্গে বাংলাদেশের রামগড়ের যোগাযোগ স্থাপনে ফেনী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করছে ভারত। আখাউড়া থেকে আগরতলা পর্যন্ত স্থাপন করা হচ্ছে রেলসংযোগ। এছাড়া মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-শাহবাজপুর, খুলনা-মংলা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে দুই পক্ষের আলোচনায় প্রায় ৫০টির ওপর বিষয় থাকবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে মারা যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত উদ্যোগ নিয়ে সফরকালে আলোচনা হবে এবং দুই নেতার যৌথ ঘোষণায় বিষয়টি স্থান পাবে।
এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী এবং ভারতীয় সেনাদেরকেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্মাননা দেয়া হবে।
যেসব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে— মানব পাচার রোধে সহযোগিতা, জাল নোট রোধে দুই দেশের সহযোগিতা, বাংলাদেশ-ভারত কোস্টগার্ডের সহযোগিতা, বাংলাদেশের বিদ্যুত্ খাতে ভারতের বেসরকারি বিনিয়োগ, মংলা বা ভেড়ামারায় ভারতের ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। এছাড়া পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সহযোগিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ভারতের জামিয়া মিলিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সহযোগিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ভারতের সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগিতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে।
সাজাপ্রাপ্ত বন্দি বিনিময়ের বিষয়টি বরাবরের মতো এবারো থাকছে দুই দেশের আলোচনায়। ভারতে পলাতক বা সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের ফেরত চাইবে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ভারতও বাংলাদেশে পলাতক বা সাজাপ্রাপ্ত ভারতীয় অপরাধীদের ফেরত চাইবে। ভারতের পক্ষ থেকে অনুপ চেটিয়াসহ আরো দুই নাগরিককে ফেরত চায় দেশটি। এর বাইরে দুই পক্ষের আলোচনায় মাদক পাচার ও অস্ত্র চোরাচালানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সীমান্ত হত্যার পরিসংখ্যান তুলে ধরে এ হত্যা বন্ধের বিষয়টিও আলোচনায় তুলবে বাংলাদেশ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় সে দেশের ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের একটি প্রতীকীভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইভাবে নরেন্দ্র মোদিও শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের যেকোনোটি প্রতীকীভাবে তুলে দেবেন।
একই সঙ্গে দুই দেশের চিহ্নিত সীমানা মানচিত্রে সই করবেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ভারতের সংসদে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থনের একটি অনুলিপি শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয়া হবে। চূড়ান্তভাবে ছিটমহল বিনিময়ের আগে ছিটমহলবাসীর নিরাপত্তার বিষয়টিও উঠে আসবে শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায়।
দুই দেশের বাণিজ্য খাতে বেশকিছু বিষয় থাকছে হাসিনা-মোদির আলোচনায়। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবারো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেশকিছু পণ্যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা তুলে নেয়ার অনুরোধ জানানো হবে। পাট ও বস্ত্র খাতে দুই দেশের সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় থাকছে। একই সঙ্গে ট্যুরিজম খাত উন্নয়নের জন্য দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করার ঘোষণা আসতে পারে। এ সফরেই দুই দেশের উপকূল এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথ দিয়ে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচলের বিষয়ে একটি সমঝোতা সই হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যুত্ খাতে ভারতের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে। মোদির সফরকালে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা। বাংলাদেশের অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ ভারতের কাছে রফতানি হতে যাচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড ও ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেডের মধ্যে একটি চুক্তি সই হবে।
দুই দেশের আলোচনায় পানি খাত নিয়ে যৌথ নদী কমিশনের ৩৮তম বৈঠকের বিষয়টি থাকছে। কারণ ২০১১ সালের পর যৌথ নদী কমিশনের আর কোনো বৈঠক হয়নি। গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়টিও থাকবে আলোচনায়। টিপাইমুখ জলবিদ্যুত্ প্রকল্প, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, অভিন্ন নদীর তীর রক্ষা এবং অভিন্ন ৫৪টি নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হবে।
নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে সাবরুমের জন্য বিলোনিয়া নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে চায় ভারত। এদিকে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে জরুরি মেরামতের জন্য ভারতের অনুমতি চায় বাংলাদেশ।
ঢাকা সফরকালে মংলা বন্দরের উন্নয়নে একটি ড্রেজার হস্তান্তর করবেন মোদি। এছাড়া এ সফরে সারদা পুলিশ একাডেমিতে ভারতের অর্থায়নে একটি আইটি ল্যাবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে। এছাড়া বাংলাদেশের খুলনা এবং সিলেটে ভারতের সহকারী হাইকমিশন খোলার ঘোষণা আসবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তের কমলসাগরে একটি সীমান্ত হাট উদ্বোধন করা হবে।এছাড়া ভারতে বাংলাদেশী টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠান সম্প্রচার, বাংলাদেশে ভারতের বিদ্যুত্ রফতানির পরিমাণ বৃদ্ধি ও ডিজেল সরবরাহ নিয়েও চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
এসবের পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকালে দুই দেশের মধ্যে নতুন দুটি বাস সার্ভিস উদ্বোধন করা হবে। কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা ও ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করবেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া নতুন এলওসির আওতায় ভারতের কাছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাইবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের চারটি, রেলের চারটি, বিদ্যুতের দুটি, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দুটি প্রকল্প রয়েছে। বণিকবার্তা।