সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় যুক্তিতর্কে তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, এই মামলা রাজনৈতিক কালিমালিপ্ত। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে ফায়দা নিতে চায়। কিন্তু সবক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হয় না। এটা সে রকমের একটি মামলা। এই মামলায় বিএনপি প্রধানকে সাজা দেয়া উচিত হবে না।
খন্দকার মাহবুব বিচারককে উদ্দেশে বলেন, 'আপনি ন্যায় বিচার করবেন। সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করবেন। এটা একটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। আপনার কাছে একটা নিবেদন থাকবে এই মামলায় যে ছায়া নথি আনা হয়েছে সেটি ঘষামাজা, স্বাক্ষরবিহীন কাগজপত্র। সেটা দিয়ে মামলাটি করা হয়েছে। খালেদা জিয়া তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তার বিরুদ্ধে ঘষামাজা কাগজ দিয়ে করা মামলায় যদি সাজা দেয়া হয় তাহলে সারা জাতি এর বিচার করবে।'
বৃহস্পতিবার (২৮ ডিসেম্বর) খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে পঞ্চম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। পরবর্তী যুক্তি উপস্থাপনের জন্য আগামী ৩ ও ৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মামলা দিয়ে ধাওয়া করা হচ্ছে। তিনি নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছেন না। তারপরও মাথা ঠাণ্ডা রেখে তিনি এই মামলা লড়ছেন।’ তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে এসেছেন। তিনি তিন মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি কখনও রাজপ্রাসাদে বসবাস করেননি। তিনি মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। সেই খালেদা জিয়ার নামে কেন এই মামলা দায়ের করা হয়েছে, তা ইতিহাসের কাছে প্রশ্ন হয়ে থাকবে। জনগণ এই মামলার বিচার করবে।’
জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের নামে বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালে এ মামলা করে দুদক। খন্দকার মাহবুব বলেন, 'ওই টাকা পাঠিয়েছিলেন কুয়েতের আমির। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান (বিএনপির সাবেক মহাসচিব) সেই টাকা এনেছিলেন। ওই টাকা জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টে গিয়েছিল। অথচ তখন কোন মামলা হল না? এক যাত্রায় পৃথক ফল ফল কেন হল? এটা তো হয় না।'
খন্দকার মাহবুব হোসেনের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শুরু করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে এম মোহাম্মদ আলী। আগামী ৩ জানুয়ারি তিনি আবারও যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করবেন।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র সৃজন করে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে দাবি করে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ভুয়া কাগজপত্র সৃজন করে খালেদার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। যেসব কাগজপত্র সৃজন করা হয়েছে তাতে ঘঁষা-মাজা, ওভার রাইটিং ও কাটাকাটি রয়েছে। তাছাড়া এগুলো তেল চিটচিটে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নথিপত্র এমন হতে পারে না’।
নথিপত্রের কোথায় কোথায় ঘঁষা-মাজা, ওভার রাইটিং ও কাটাকাটি রয়েছে- সেগুলো আদালতের সামনে তুলে ধরে বলেন, এ মামলায় খালেদার সাজা হতে পারে না। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করায় দুদক কর্মকর্তার শাস্তিও দাবি করেন এ জে মোহাম্মদ আলী।
এ সময় আদালত বলেন, ‘যে ডকুমেন্টগুলো নিয়ে এতো কথা বলছেন, এ ডকুমেন্টগুলো ৩১তম সাক্ষী যখন আদালতে দাখিল করেন, তখন আপত্তি দেননি কেন? তখন আপত্তি না দিয়ে যুক্তিতর্কের সময় এ দাবি করলে মেলাবেন কি করে?’
আদালতের এ প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট আব্দুর রেজ্জাক খান বলেন, 'ভুয়া কিংবা সৃজিত কাগজপত্রের বিষয়ে আপত্তি দিলেই কি, না দিলেই কি। আপত্তি না দিলেই ভুয়া ডকুমেন্ট আসল হয়ে যায় না।'
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আদালতে যান খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। পরে ১৫ মিনিটের জন্য চা-বিরতি দেওয়া হয়।
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রাজধানীর রমনা থানায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা করে দুদক। এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে একটি বিদেশি ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ এনে মামলাটি করা হয়। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ আগষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার শুরু করেন।
এ মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ আসামি ছয়জন। অপর পাঁচ আসামি হলেন—খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মোমিনুর রহমান।
আসামিদের মধ্যে ড. সিদ্দিকী ও মোমিনুর মামলার শুরু থেকেই পলাতক। আর তারেক রহমান গত ৯ বছর ধরে লন্ডনে রয়েছেন। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। বাকিরা জামিনে রয়েছেন।