সিলেটটুডে ডেস্ক | ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮
বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাত অতি-মুনাফাভিত্তিক বানিজ্যিকীকরণের প্রভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অভাব, পরিদর্শন ও তদারকির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এতে করে সেবাগ্রহীতাকে অবর্ণনীয় দুর্দশার শিকার হতে হচ্ছে বলে মন্তব্য টিআইবির।
বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সংস্থাটির ধানমণ্ডি কার্যালয়ে 'বেসরকারি চিকিৎসাসেবা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়' শীর্ষক এত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করা হয়। এর প্রেক্ষাপটে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় একটি স্বাধীন কমিশন গঠনসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছে টিআইবি।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে বেসরকারি ৬৬ হাসপাতাল এবং ৫০ রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
এ অনুযায়ী দেখা যায়, বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগ-নির্ণয় কেন্দ্র নিবন্ধিত না হয়েই কার্যক্রম শুরু করে এবং দেশব্যাপী কতগুলো অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে-সে সম্পর্কিত কোনো তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১১৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৭টিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই। ৩২টিতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। ৭৭ প্রতিষ্ঠানে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক টয়লেট ব্যবস্থা নেই। ৪২ প্রতিষ্ঠান নিয়ম বহির্ভূতভাবে আবাসিক এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এছাড়া ৯ হাসপাতালে পোস্ট অপারেটিভ কক্ষ নেই। ৫২টিতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নেই, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ২০টি হাসপাতাল অনুমোদন না নিয়েই বিশেষায়িত সেবা যেমন- আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ, কার্ডিয়াক সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ২৩ হাসপাতাল অনুমোদন ছাড়াই শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫০ রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের মধ্যে ১২টিতে পৃথক নমুনা সংগ্রহ কক্ষ এবং ২৬টিতে প্যাথলজিস্টদের পৃথক কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তাসলিমা আক্তার ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ জুলকারনাইন।
এতে বলা হয়, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি চিকিৎসাসেবা নিয়ে সরকারের মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে। আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের কাছ থেকে সাড়া না পাওয়া, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় বেসরকারি চিকিৎসাসেবা আইনের খসড়া নিয়ে কাজ করা হলেও তা এখনো আইনে পরিণত করা সম্ভব হয়নি।
বেসরকারি হাসপাতালের নিবন্ধন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, নিবন্ধন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তদারকি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিদর্শনের তারিখ হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে আগে থেকে অবহিত করা এবং সে অনুযায়ী নথিপত্র সঠিক রাখা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি'র পক্ষ থেকে বেসরকারি চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নসহ এ খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ করা হয়। এ লক্ষ্যে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সংক্রান্ত খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করে আইন হিসেবে প্রণয়নমহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতকে একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাত স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও উচ্চ মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে খাতটির বিকাশ ঘটছে। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশের ওপর ভিত্তি করে এ খাতের সেবা চলছে। ওই অধ্যাদেশে কোনো বিধিমালা না থাকায় বিভিন্ন সময় প্রণীত সরকারি নির্দেশের ওপর ভিত্তি করেই খাতটি পরিচালিত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে টিআইবি'র বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ বক্তৃতা করেন।