সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৩ জুন, ২০১৫
মানববন্ধন পরবর্তী মিছিলের একাংশের ছবি তুলেছেন নাসিম নেওয়াজ
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিরোধে আইন প্রণয়নের দাবিতে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও অনুষ্ঠিত হলো মানববন্ধন, মিছিল ও সমাবেশ। সমাবেশে বক্তাদের কণ্ঠে অভিন্ন দাবি উচ্চারিত হয়। বক্তারা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্যে আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
শনিবার (১৩ জুন) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের পাশাপাশি চট্টগ্রামের জামালখানস্থ প্রেসক্লাবের সম্মুখে অনুষ্ঠিত হয় মানববন্ধন, মিছিল ও সমাবেশ। সমাবেশে ইশতিহার পাঠ করেন বাঁধন। ইশতিহারে বলা হয়:
"দীর্ঘ নয় মাস মহান মুক্তিসংগ্রামের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি স্বপ্নের সোনার বাংলা। দেশমাতৃকার টানে জীবন দিয়েছে ত্রিশ লক্ষ বীর। সম্ভ্রমহানি হয়েছে দুই-চার লক্ষাধিক মা-বোনের। স্বাধীনতার জন্য আমাদের মত এত ত্যাগ বিশ্বের অন্য কোন জাতিকে স্বীকার করতে হয়নি। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পরে বিভিন্ন স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিদের পৃষ্টপোষকতায় স্বাধীনতাবিরোধী মহল ফুলে ফেঁপে উঠেছে; তারই ধারাবাহিকতায় তারা আজ ইতিহাস বিকৃতির মতো ঘৃণ্য কাজ শুরু করেছে।
শুধুমাত্র স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবিরই নয়, জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিএনপিও ইতিহাস বিকৃতি শুরু করেছে। অথচ আমাদের সংবিধানের শুরুতে স্পষ্টভাবে বলা আছে- আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি। আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আÍনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল -জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।
সংবিধানে থাকা স্বত্বেও কেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিরোধে আইনের বাস্তবায়ন হয় না? কেন এখনো দম্ভ দেখানোর দুঃসাহস করে রাজাকার শিরোমণি গোলাম পুত্র? এসব প্রশ্নের উত্তর থাকলেও অনেকে নিরব আছে! রাষ্ট্রযন্ত্রের এই নিরবতায় কি প্রমাণ করে না যে, রাষ্ট্র এসবের ব্যাপারে উদাসীন? তাহলে কি অদূর ভবিষ্যতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মরা বিকৃত ইতিহাস জানবে? আবার কি পাঠ্য পুস্তকে ভুল ইতিহাস থাকবে, বলা হবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল মেজর জিয়া। লক্ষণীয় বিষয়, আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ শে মার্চ; কিন্তু মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিল ২৭ শে মার্চ। তদুপরিও কেন রাষ্ট্রের নীরবতা থাকবে?
আমরা সংবিধানের মান সমুন্নত রাখতে ,মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ইতিহাস আগামি প্রজন্মকে জানাতে এবং বর্তমান প্রজন্মের বিভ্রান্ত হওয়া রোধকল্পে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সংবিধানের যথাযথ প্রয়োগ চাই অন্যথায় ইতিহাস বিকৃতিরোধে Law Against Genocide Denial চাই।
আমাদের ইতিহাস লড়াইয়ের ইতিহাস। লড়াইয়ের মাধ্যমে আমাদের অর্জন। তাই এদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও তার ইতিহাসকে বিকৃত করে, এমন ব্যক্তি গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন হোক, সে আইনের প্রয়োগ হোক। কেউ যেনো আর কখনোই আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, মুক্তিবাহিনীর কর্মকাণ্ড অথবা একাত্তরে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের কুকীর্তি সম্পর্কে অসত্য বক্তব্য না রাখতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময় নাজি গণহত্যায় অসংখ্য মানুষ মারা যায়। ইউরোপের ১৪টি দেশে সেই গণহত্যাকে অস্বীকার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এবছরেই ১১ ফেব্রুয়ারি ফরাসি ইতিহাসবিদ Vincent Reynouard- কে দুবছরের জেল দেয়া হয় Laws against Holocaust Denial-এর মাধ্যমে। ইহুদীনিধন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পুরো ইউরোপব্যাপী গণহত্যা, আর্মেনীয় গণহত্যাসহ সেসময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ সমর্থনের কারণে গত ১৬ বছরে উনিশজন প্রতিষ্ঠিত সুপরিচিত রাজনীতিবিদ, ঐতিহাসিক এবং ক্যাথলিক ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জেল জরিমানা করা হয়েছে।
খোদ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যারা সবসময় আমাদের যুদ্ধাপরাধীর বিচারে নাক গলানোর চেষ্টা করে, তারাই ২০০৭ সালে Gayssot Act এর অনুরূপ আইন পাস করে, ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালকে স্বীকার করে অভিযুক্তকে অনধিক তিন বছরের সাজা দেয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত জানায়।
আমরা আশা করছি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার অনতিবলম্বে সংবিধান সমুন্নত রাখার নিমিত্তে আইনের যথার্থ প্রয়োগ করবে অন্যথায় ইতিহাস বিকৃতি রোধে নতুন আইন করে ইতিহাস বিকৃতি রোধকল্পে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।"
মানববন্ধনে জালাল উদ্দিন রুমির সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন অন্যতম আয়োজক বাঁধন, মাহিদুল ইসলাম নকীব, অনিন্দ্য অনিক, ইসমাইল আজাদ শাকিল, জুয়েল সহ চট্টলার মুক্তিযুদ্ধ সচেতন সহস্র তরুণ প্রাণ।
উক্ত আয়োজনের সার্বিক তত্বাবধানে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভ এর প্রতিষ্ঠাতা সাব্বির হোসাইন, সংহতি প্রকাশ করেছেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র এবং বিবর্তন স্কুল।