Sylhet Today 24 PRINT

ঢাকা ও সিলেটে ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনায় ১ হাজার ৩৮১ কোটি টাকার প্রকল্প

সিলেট শহরের ভূমি জোনিং করে কোন এলাকায় সর্বোচ্চ কত তলা ভবন নির্মাণ করা যাবে, তা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। একই সঙ্গে এসব শহরে নতুন করে পুকুর ভরাট করে ভবন নির্মাণ যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে।

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ২৬ জুন, ২০১৫

নেপালে সম্প্রতি সংঘটিত ভূমিকম্পে বাংলাদেশেও ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একাধিক সমীক্ষায় দেশে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। এ অবস্থায় ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনায় ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ১ হাজার ৩৮১ কোটি টাকার এ প্রকল্পসহ মোট সাতটি প্রকল্প গতকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে।

অনুমোদিত মোট ২ হাজার ১৪ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট’ শীর্ষক প্রকল্পটির বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি।

ভূগর্ভস্থ স্তরের ফল্টলাইন বা চ্যুতিরেখার অবস্থান ঢাকার উপকণ্ঠে মধুপুরে। সিলেট জেলার অবস্থানও ফল্টলাইনের ওপর। ঢাকা ও সিলেটে সম্ভাব্য ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনাই ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট’-এর উদ্দেশ্য। ১ হাজার ৩৮১ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ব্যয়ের ৪৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বহন করবে সরকার। বাকি ১ হাজার ৩৩২ কোটি ১০ লাখ টাকা সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক।

‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট’ সম্পর্কে বৃহস্পতিবার একনেক সভা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা ভূমিকম্প ঠেকাতে পারি না, তবে এর প্রভাব যাতে জনজীবনে কম হয়, সে ব্যবস্থাপনা করতে পারি। এজন্যই আমরা প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছি। রাজউক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর ও পরিকল্পনা কমিশন যৌথভাবে ২০২০ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকি সংবেদনশীল ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেট শহরের ভূমি জোনিং করে কোন এলাকায় সর্বোচ্চ কত তলা ভবন নির্মাণ করা যাবে, তা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। একই সঙ্গে এসব শহরে নতুন করে পুকুর ভরাট করে ভবন নির্মাণ যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। ভবন নির্মাণে ব্যবহূত উপাদান ভূমিকম্প সহনশীল কিনা, রাজউক তাও পরীক্ষা করে দেখবে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন স্যাটেলাইট ও কন্ট্রোল অফিস নির্মাণসহ হুইল ড্রেজার, এক্সক্যাভেটর, ক্রেন ও মোবাইল জেনারেটরের মতো ভারী যন্ত্রপাতি কিনবে। আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এ-সংক্রান্ত ইনস্টিটিউট স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনবে। প্রকল্পের আওতায় এ তিন প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কিনা, তা তদারক করবে পরিকল্পনা কমিশন।’

ভূবিজ্ঞানীদের মতে, বিভিন্ন প্লেট ও সাব-প্লেট দিয়ে ভূগর্ভ গঠিত। এ রকম দুটি প্লেটের মাঝখানে যে ফাঁক থাকে, তাকে বলা হয় ফল্টলাইন। আর ভূগর্ভস্থ প্লেটগুলো গতিশীল। ফল্টলাইনে দুটি চলন্ত প্লেটের সংঘর্ষ হলে অথবা হঠাৎ ফল্টলাইনে শূন্য অবস্থার সৃষ্টি হলে ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশে এমন বেশ কয়েকটি ফল্ট জোন সচল অবস্থায় রয়েছে, যার মধ্যে মধুপুর ফল্টলাইন অন্যতম।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক ও আর্থকোয়েকস অ্যান্ড মেগাসিটিস ইনিশিয়েটিভ (ইএমআই) প্রত্যক্ষ সমীক্ষার ভিত্তিতে গত বছর ‘ঢাকা প্রোফাইল অ্যান্ড আর্থকোয়েক রিস্ক অ্যাটলাস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনেও ভূমিকম্পের ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রত্যক্ষ সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধুপুরে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূকম্পন হলে ঢাকার ২৭ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর বেশির ভাগই উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। এতে ৫০ হাজার মানুষ নিহত ও দুই লাখ মানুষের আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ মাত্রার ভূমিকম্পে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫৭৩ কোটি ডলার বা ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার এ ধরনের প্রস্তুতিমূলক প্রকল্প গ্রহণ করতে উদ্যোগী হয়েছে।

একনেকের বৈঠকে ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা ছাড়াও আরো ছয়টি প্রকল্প অনুমোদন হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন রাস্তা মেরামতে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পুরনো নির্মাণ সামগ্রী পুনর্ব্যবহারের পাইলট প্রকল্প। প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে বলে পরিকল্পনামন্ত্রী উল্লেখ করেন।

অনুমোদিত এ প্রকল্পের নাম ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সড়কগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোল্ড রিসাইক্লিং প্লান্ট ও ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ’। প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০১৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করবে বলে একনেক সভায় জানানো হয়।

এছাড়া ট্রেনের সঙ্গে অন্য যানবাহনের সংঘর্ষ এড়াতে ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে একনেক। প্রকল্প দুটির আওতায় লেভেল ক্রসিংয়ে গেট স্থাপন ও গেটকিপার নিয়োগ করা হবে। বর্তমানে সারা দেশে রেলপথে মোট ২ হাজার ৪৯৪টি লেভেল ক্রসিং গেট রয়েছে। এর মধ্যে ৬৭২টি লেভেল ক্রসিং গেটে ১ হাজার ৮৮৯ জন গেটকিপার নিয়োগসহ সিগনালিং ব্যবস্থা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের জন্য দুটি আলাদা প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০১৭ নাগাদ প্রকল্প দুটো বাস্তবায়ন করবে।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে একনেক। কক্সবাজার জেলায় উপকূলীয় বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের ২০টি পোল্ডার ৫০ বছরের পুরনো। এর মধ্যে ছয়টি পোল্ডার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে এ এলাকায় সহজেই লোনা পানি ঢুকে পড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। ক্ষতিগ্রস্ত ছয়টি পোল্ডার পুনর্বাসন করবে সরকার। ২৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১৭ সাল নাগাদ কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, চকোরিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেষখালীতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এছাড়া ১৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলার সাঙ্গু ও চাঁদখালী নদীর উভয় তীর সংরক্ষণে অন্য একটি প্রকল্পেরও অনুমোদন দেয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় ২০১৮ সাল পর্যন্ত।


একই সভায় একনেক সিলেট বিভাগের সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৩০টি উপজেলায় শস্য নিবিড়তা বাড়াতে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। মোট ৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, কৃষি বিপণন অধিদফতর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ২০১৯ সাল নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

এছাড়া রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৬ সালের মার্চ নাগাদ একটি ডাটাবেজ তৈরির কাজ সম্পন্ন করবে। রোহিঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের আওতায় এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.