সিলেটটুডে ডেস্ক | ০১ অক্টোবর, ২০১৮
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দশ দিনের এই সফর শেষে সোমবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে লন্ডন হয়ে দেশে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।
শনিবার বিকালে নিউ ইয়র্ক থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে লন্ডনের উদ্দেশ্য রওনা হন শেখ হাসিনা। সেখানে দশ ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করে বিমানে দেশের পথে রওনা হন।
এই সফরে প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্কে ছয়দিন কর্মব্যস্ত সময় কাটান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া ছাড়াও বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গেও শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি সঙ্কট সামাল দিতে দূরদর্শী ভূমিকার জন্য নিউ ইয়র্কে ইন্টার প্রেস সার্ভিসের ‘ইন্টারন্যাশনাল এচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ এবং গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশনের ‘স্পেশাল রিকগনিশন ফর আউটস্ট্যান্ডিং লিডারশিপ’ সম্মাননা দেওয়া হয় শেখ হাসিনাকে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন শেখ হসিনা।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি বলেন, “আমরা আশাহত হয়েছি, কেননা আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।
“জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে- আমরা তার আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।”
সাধারণ পরিষদে ভাষণের আগে ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব ‘পূর্ণ সমর্থন ও সব ধরনের সহযোগিতার’ প্রতিশ্রুতি দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও পরদিন সকালে নিউ ইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন। পম্পেওর সঙ্গে বৈঠক শেষে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, “এই বৈঠক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেটের সঙ্গে খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে; রোহিঙ্গা নিয়ে, আমাদের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”
এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থার কর্তব্যক্তিরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক সেদিন এক ব্রিফিংয়ে বলেন, “গ্লোবাল রিডিং হল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের পরে তৃতীয়বারের মত সরকার গঠন করবেন। এ জিনিসটা আমরা আলোচনার মধ্যে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি।”
ঢাকা থেকে ২১ সেপ্টেম্বর রওনা হয়ে দুদিন লন্ডনে কাটিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেদিন সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেন তিনি।
নিউ ইয়র্কে সফরের দ্বিতীয় দিন ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শরণার্থী সঙ্কট নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে যোগ দিয়ে শেখ হাসিনা এক বছরের বেশি সময় ধরে চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কট অবসানে তিনটি প্রস্তাব বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন।
প্রথমত, মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আইন ও নীতি বাতিল এবং বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক স্থানান্তরিত করার প্রকৃত কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নাগরিক সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে একটি ‘সেইফ জোন (নিরাপদ অঞ্চল)’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তৃতীয়ত, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সুপারিশের আলোকে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচাতে হবে।
সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী মাদক সমস্যা নিয়ে এক আলোচনায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ইউএস চেম্বার অফ কমার্সের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ ও গোলটেবিল বৈঠকে শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ২৪ সেপ্টেম্বর নেলসন ম্যান্ডেলা শান্তি সম্মেলনে বিশ্ব শান্তির জন্য বিশ্ব নেতাদের সব বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সেদিন বিকালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইনভেস্টমেন্ট ফর এডুকেশন অব উইমেন অ্যান্ড গার্ল’ শীর্ষক এক আলোচনায় শেখ হাসিনা বলেন, রাখাইনে ফিরে যাওয়ার পর রোহিঙ্গা শিশুরা যাতে আগের মত শিক্ষাসহ অন্যান্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না থাকে, সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারে বিনিয়োগ করতে হবে।
ওই গোলটেবিল আলোচনায় তিনি সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনটি প্রস্তাব দেন।
প্রথমত, সংঘাত, জাতিগত নিধন এবং গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা শিশুদের মানসিক আঘাত লাঘবে এবং সামাজিক প্রয়োজন মেটাতে নজর দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, সংঘাত ও জাতিগত নিধন থেকে পালিয়ে যাওয়া শিশুরা সাধারণ স্কুলে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যায় পড়তে পারে। তাই তাদের জন্য অনানুষ্ঠানিক এবং দৈনন্দিন জীবনের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শিশুরা এখন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে বসবাস করছে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, জাতিসত্তা এবং ভাষা অনুযায়ী এই শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক মন্ত্রী জেরেমি হান্ট ওইদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন আয়োজিত সাইবার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে ডিজিটাল বিশ্বকে নিরাপদ রাখতে কার্যকর ভূমিকা নিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ সাইবার অপরাধের হাত থেকে বাংলাদেশের মত ছোট দেশগুলোকে বাঁচাতে জাতিসংঘকে এগিয়ে আসতে বলেন।
জাতিসংঘ সদরদপ্তরে সেদিন আরেক এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বরাদ্দ কমানো হলে তা বিশ্বের বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে।
একই দিনে নিউ ইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের আয়োজনে এক আলোচনায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। মানবসভ্যতার গতিপথ পাল্টে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে চতুর্থ যে শিল্পবিপ্লবের আগমন নিয়ে সারা বিশ্বে আলোচনা চলছে, তার অভিঘাত সামাল দিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে স্বল্পমূল্যে ও সহজে প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে পরদিন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক উচ্চ পর্যায়ের সংলাপে অংশ নেন শেখ হাসিনা। সেখানেও তিনি দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সহায়তা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের আহ্বান জানান।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর, ইউএনএইচসিআরের প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডি, এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট কের্স্টি কালিজুলেইদ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি মঘেরনিনি এবং মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত ক্রিশ্চিয়ানা স্ক্র্যানার বারগেনার সেদিন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নির্যাতন নিয়ে ওআইসি কন্টাক্ট গ্রুপের বৈঠকে অংশ নিয়ে শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্য মুসলিম দেশগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
এছাড়া লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট ডালিয়া গ্রাইবস্কেইটের আমন্ত্রণে নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সেদিনই শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মাউরা এবং ৭৩তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি মারিয়া ফেরনান্দা এসপিনোসা গার্সিসওর বৈঠক হয়।
সন্ধ্যায় ‘ইন্টারন্যাশনাল এচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘স্পেশাল রিকগনিশন ফর আউটস্ট্যান্ডিং লিডারশিপ’ সম্মাননা গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা।
সেদিন রাতে নিউ ইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে একেবারেই ঘরোয়া পরিবেশে সাদামাটাভাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন পালিত হয়।