সিলেটটুডে ডেস্ক | ০৯ মার্চ, ২০১৯
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কোথাও কোনও রকম অনিয়ম দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সেই কেন্দ্রের ভোট বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনে অনিয়মের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ কোনও নির্বাচনী কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে শনিবার (৯ মার্চ) বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে ইসির অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমান এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এসব বিষয়ে কমিশন সংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
রোববার (১০ মার্চ) ৭৮টি উপজেলায় ভোট নেওয়া হবে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে ভোটগ্রহণ। পাঁচ দফায় হতে যাওয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের এটি প্রথম ধাপ।
নির্বাচনপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কেউ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনও ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণে অনিয়ম হলে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী করা হবে। ওই কেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়ী করা হবে। অনিয়ম হলে সেখানকার ভোটগ্রহণ তাৎক্ষণিক বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচন হচ্ছে একটি স্থানীয় নির্বাচন। প্রার্থীরা যথেষ্ট তৎপর থাকেন। তারা সেভাবে প্রচার করেছেন, ক্যাম্পেইন করেছেন। এ ভোটার উপস্থিতির হার অনেক বেশি হবে বলে আমরা ধারণা করছি।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা সিটি নির্বাচনের বিষয়ে আপনারা জানেন যে, অল্প সময় ছিল এবং দিনটিও ছিল অত্যন্ত বর্ষামুখর। ইত্যাদি কারণে হয়তো উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। নতুন যে ওয়ার্ডগুলো ছিল যেখানে কাউন্সিলররা নির্বাচন করেছে, সেখানে কিন্তু উপস্থিতির সংখ্যা বেশি ছিল। কাজেই উপজেলা পর্যায়ে কিন্তু উপস্থিতি বেশিই থাকে।’
কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও নজির কি আছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘একেবারে যে হয় নাই তা না। অনেক সময় বিভিন্ন সময়ে আমরা করেছি। স্পেসিফিক যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, অবশ্যই আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি।’
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘এমন কোনও নিদর্শন দেখাতে পারবেন না যে, যেখানে কমিশন অত্যন্ত লিনিয়ান ছিল, নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত অবহেলা করেছে। এরকম আপনি লক্ষ্য করবেন না। সব সময় নির্বাচন কমিশন তার নিজের অবস্থানে রয়েছে।’
গতকাল শুক্রবার তিন উপজেলার ভোট বন্ধ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কমিশন মনে করেছে যে, এখানে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন এ পর্যায়ে সম্ভব নয়। পরবর্তীতে এ উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হবে। কমিশন সন্তুষ্ট হয়েছে যে, এই নির্বাচন বন্ধ করা প্রয়োজন।’
মোখলেছুর রহমান জানান, ৩ ফেব্রুয়ারি প্রথমে ৮৭টি উপজেলায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে কমিশন। তার মধ্যে থেকে আদালতের আদেশে তিনটি এবং কমিশন তিনটি উপজেলার ভোট স্থগিত করে। আর তিনটি উপজেলার সব পদে একক প্রার্থী থাকায় সেখানে ভোটের প্রয়োজন পড়বে না। সুতরাং রোববার ৭৮টি উপজেলায় ভোট হবে।
৭৮ উপজেলার মোট ভোটার ও প্রার্থী
এসব উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১ কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫০ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ৫ হাজার ৮৪৭টি। চেয়ারম্যান পদে ২০৭ জন, ভাইস চেয়ারম্যান ৩৮৬ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৪৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ২৮ জন
প্রথম ধাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ২৮ জন। এরমধ্যে চেয়ারম্যান পদে ১৫ জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ছয়জন এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে সাতজন রয়েছেন।
ভোট কেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকার নিরাপত্তা
প্রতি ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্যে একজন করে পুলিশ কর্মকর্তাসহ পুলিশ ও আনসারের ১৫ থেকে ১৬ জন সদস্য ভোট গ্রহণের আগে ও পরে মোট পাঁচ দিন মোতায়েন থাকবে। প্রয়োজনে এই সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে। নির্বাচনী এলাকাগুলোর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে পুলিশ, এপিবিএন, আনসার, র্যাব, কোস্ট গার্ড ও বিজিবির মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন থাকবে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নির্বাচনী অপরাধের বিচার
আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন নির্বাচনী অপরাধের বিচারের জন্য প্রতি উপজেলায় একজন করে নির্বাহী হাকিম নিয়োগ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে প্রতি তিন ইউনিয়নের জন্য একজন করে নির্বাহী হাকিম পাঁচদিনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও তাৎক্ষণিক বিচার করার জন্য ভোটগ্রহণের পরের দিন পর্যন্ত প্রতি উপজেলায় একজন করে বিচারিক হাকিম নিয়োগ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে ৯ উপজেলায় ভোট হচ্ছে না
প্রথম ধাপের ৮৭টি উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও নির্বাচন হচ্ছে ৭৮টি উপজেলায়। নির্বাচন কমিশন ও আদালত কর্তৃক ছয়টি উপজেলার ভোট স্থগিত করা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী, নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা ও সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার নির্বাচন স্থগিত করে ইসি। রাজশাহী জেলার পবা উপজেলা, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলা ও সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার নির্বাচন আদালত কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও জামালপুর জেলার মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ এবং নাটোর জেলার সদর উপজেলায় সব প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় এই তিন উপজেলা নির্বাচন হচ্ছে না। আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় কাল নীলফামারীর সদর ও জলঢাকা উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচন হচ্ছে না।
নয় সংসদ সদস্যকে নির্বাচনী এলাকা ছাড়ার নির্দেশ
উপজেলা নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে নয়জন সংসদ সদস্যকে সংসদীয় এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসি। এরা হলেন, নাটোর-৪ আসনের সাংসদ আওয়ামী লীগের আব্দুল কুদ্দুস, নেত্রকোনা-৫ আসনের সাংসদ ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, রাজশাহী-১ আসনের সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-২ আসনের জয়া সেন গুপ্তা, কুড়িগ্রাম-৩ আসনের এম এ মতিন, হবিগঞ্জ-৩ আসনের মো. আবু জাহির, কুড়িগ্রাম-১ আসনের আছলাম হোসেন সওদাগর, সুনামগঞ্জ-১ আসনের মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও লালমনিরহাট-১ আসনের মোতাহার হোসেন।
ওসি ও মন্ত্রীর এপিএসের বিরুদ্ধে মামলা করবে ইসি
উপজেলা নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করে তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। এ ছাড়াও উপজেলা নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগে ইসি সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর এপিএসের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রংপুর বিভাগের ২৩ উপজেলায় ভোট
রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলা, আটোয়ারী, বোদা, দেবীগঞ্জ ও তেঁতুলিয়া উপজেলা; নীলফামারী জেলার সদর, ডোমার, ডিমলা, জলঢাকা, সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা; লালমনিরহাট জেলার সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা ও কালীগঞ্জ উপজেলা; কুড়িগ্রাম জেলার সদর, ভুরুঙ্গামারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, রাজারহাট, রাজিবপুর, চিলমারী ও রৌমারী উপজেলায় রোববার ভোট নেওয়া হবে।
ময়মনসিংহ বিভাগের ১৩ উপজেলায় ভোট
জামালপুর জেলার সদর, সরিষাবাড়ী, ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা; নেত্রকোণা জেলার সদর, বারহাট্টা, দুর্গাপুর, খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, কলমাকান্দা ও মদন উপজেলায় ভোটগ্রহণ রোববার।
সিলেট বিভাগের ১৭ উপজেলায় ভোট
সুনামগঞ্জ জেলার সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা, ধর্মপাশা, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলা; হবিগঞ্জ জেলার সদর, বাহুবল, মাধবপুর, চুনারুঘাট, লাখাই, নবীগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলায় ভোট নেওয়া হবে রোববার।
রাজশাহী বিভাগের ২৫ উপজেলায় ভোট
সিরাজগঞ্জ জেলার সদর, বেলকুচি, চৌহালী, কাজীপুর, রায়গঞ্জ, শাহজাদপুর ও তাড়াশ উপজেলা; জয়পুরহাট জেলার সদর, পাঁচবিবি, আক্কেলপুর, কালাই ও ক্ষেতলাল উপজেলা; নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, লালপুর ও সিংড়া; রাজশাহী জেলার তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, বাগমারা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় রোববার ভোট নেওয়া হবে।