মারূফ অমিত | ০৮ আগস্ট, ২০১৫
শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানী ঢাকায় নিলয় নীল নামক মুক্তমনা এক ব্লগারকে নিজ বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তাকে হত্যার পর পরই শাহবাগে সাধারণ জনতা অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।
তারা ব্লগার নিলয় নীল হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি নিহত নীলের খুনিদেরকে অনতিবিলম্বে গ্রেফতারের দাবী জানান। ব্লগার নিলয় নীল হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্নজনের স্ট্যাটাস তুলে ধরা হলো:
সাংবাদিক অঞ্জন রায় লিখেছেন- কোন বাড়তি কথা শুনতে চাইনা- যে পুলিশ অফিসার নিলয়ের জিডি নেননি আর যে পুলিশ অফিসার নিলয়কে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাদের বরখাস্ত করুন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন- একটা সিক্রেট বলি। আমাদের অ্যানালিটিক্স বলে, আজ যেটা সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু, কয়দিন পর তার ফলোআপ রিপোর্টগুলো খুব কম সংখ্যক পাঠকই পড়েন। এটাই স্বাভাবিক। নিত্য-নতুন ইস্যু না হলে আমাদের চলে না। এভাবে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধার আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের সব উত্তেজনা শেষ হয়ে যায়। আমরা সমস্যার মূলটা উৎপাটন করতে পারি না। কয়দিন পর নিলয় হত্যার শিকার হয়। আমরা কয়দিন খুব হইচই করি। তারপর তার নামও ভুলে যাই। নতুন এক হত্যাকাণ্ডের পর আগেরজন শুধুই এক রেফারেন্স।
গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার তার ফেসবুক পেজে লিখেন- "নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় নীল, ক্ষমা করে দিস। তোকে বাঁচাতে পারলাম না! জেনে রাখিস, যতো আঘাতই আসুক না কেন শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত রাজপথে থাকবো।"
ব্লগার অমি রহমান পিয়াল তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন- "পরিবেশটা খুব সুন্দরভাবেই তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এই দেশে ধর্মের ধ্বজাধারী স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং ধর্ম বিক্রি করে জাগতিক চাহিদা পুরণ করাদের জন্য একটা দারুণ আতঙ্ক হয়েই এসেছিলো প্রজন্মের জাগরণ। গণজাগরণ মঞ্চ নামে যা পূর্ণতা পেয়েছিলো। তুচ্ছ রাজনৈতিক মতভেদ, ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া, ইগো বা অহমের আধিক্য, হাম রাতা হ্যায় ভাব ইত্যাদিতে শতধা বিভক্তি আরও জোরদার করেছিলো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি সাজা কিছু লোকের অন্যায় আরোপ। অবিরত সেই চরিত্রহরণ একটা সম্ভাবনাময় জাগরণকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। এরপর শুরু হয়েছে টুকরোগুলো শারীরিকভাবে টুকরো টুকরো করার পালা। যার সর্বশেষ নমুনা নীলয় নীল।
পরিকল্পিত ফাঁদে পা দিয়ে জাগরণকে ত্যাজ্য, পরিত্যাগ করেছে প্রজন্ম। এবার তাতে জড়িতদের হিসাব চুকানোর পালা। আজ ইমরান এইচ সরকার শাহবাগে ব্লগার হত্যার বিরুদ্ধে দাড়ালে সেখানে দশজনও যাবে না। আমি দাড়ালে ৫ জনও যাবে না। কারো ডাকে তারা আসবে না। অপেক্ষা করবে নতুন নতুন মৃত্যুর। দেশের সম্ভাবনাময় মেধা এবং আগামী বুদ্ধিজীবিদের ধারাবাহিক নিধন চালিয়ে যাবে নতুন রূপে ফেরা আল-বদর। সরকার যাচাই করবে ভোটের পাল্লা কোনদিকে ভারী। কাদের পক্ষ নিলে কিংবা কাদের ব্যাপারে নির্বিকার থাকলে ক্ষমতায় বিরূপ প্রভাব পড়বে না। আমরা অপেক্ষা করবো মৃত্যুর। জীবিত বিপ্লবীর কদর কোনো দেশে নেই তা জেনেই এই অপেক্ষা কিংবা প্রতীক্ষা। বিকল্প নেই। লাশ হবো না দেশ ছাড়বো?"
লেখক মাসকাওয়াথ আহসান লিখেছেন- নিলয় ছেলেটি অস্ত্র হাতে নিয়ে চাঁদাবাজি করেনি, চাপাতি হাতে নিয়ে জঙ্গীবাজী করেনি। সে কেবল লিখেছে, তার মতামত প্রকাশ করেছে। এই মত প্রকাশের অধিকার তাকে দিতে না পারা, তার হত্যার আশংকার অভিযোগ গ্রহণে পুলিশের অস্বীকৃতি জানানো, এবং তার হত্যার পর রংধনুর মত মৃতদেহের বাসায় পুলিশ উদিত হয়ে বাংলাছবির রুটিন সংলাপ, হত্যার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত বলা; এসবই আন্তরিকতা ও যোগ্যতার অভাবের ফলাফল। রাষ্ট্র আগ্রহী নয় মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে উতসাহিত করতে। প্রতিমাসে একটি করে ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যার দেজাভু ফিরে এলেও রাষ্ট্র ঘুমিয়ে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আমিনুল ইসলাম লিখেছেন- ব্লগার নিলয় নীলকে আজ হত্যা করা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। এই দেশে আসলে মানুষ থাকে না। এই দেশে থাকে কিছু আস্তিক, কিছু নাস্তিক, কিছু ব্লগার, কিছু পুলিশ, সাংবাদিক, ডাক্তার, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ ইত্যাদি ইত্যাদি।। "মানুষ" বলে কোন শব্দ এই দেশে নাই! "মানুষ" শব্দটা আসলে মিডিয়া সৃষ্ট!
ব্লগার আতিক বাঙাল লিখেছেন- রাষ্ট্রের কাছে তার সব নাগরিক তাত্ত্বিকভাবে সমান কিন্তু ব্যবহারিকভাবে কেউ কেউ পরিত্যাক্ত। আপাতত জন্মভূমীতে ব্লগাররা পরিত্যাক্ত নাগরিকের তালিকার এক নম্বরে আছে। তারা চাপাতির কোপে মরে গেল বা বিদেশে পালিয়ে গেলে সকলে সুখে শান্তিতে বসত করিতে থাকিবে-
লিটন সি ভৌমিক তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন- " যুবকগুলোর দোষ কি ছিল আজও বুঝলাম না! এই ব্যস্ততম আমেরিকায় বসে লেখালেখি করতো অভিজিত রায়। যেখানে আমেরিকার মানুষ সন্তান নিতে ভয় পায়। জিগ্গেস করলে বলে, 'নিজকে সময় দিতে পারছি না; আবার একটা মানুষকে পৃথিবীতে এনে তাকে কেন বঞ্চিত করবো'। সেই ব্যস্ততম সমাজে বসে- ১৩২০০ কিমি দূরে বাংলাদেশ নামক একটি ভূখণ্ডের মানুষদের জন্য প্রতিনিয়ত লিখতো। ক্রেডিট কার্ড, পাজেরো, স্টাইলিশ লাইফকে পাশে রেখে; সবচে মূল্যবান পিএইচডিকে দুরে রেখে; চর্চা করতেন- মহাবিশ্বের উদ্ভব, প্ররিক্রমা; চিন্তা- বিশ্বাস- অবিশ্বাস এসবের বিবর্তন; মানুষের বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্ক; ধর্ম-বিশ্বাস এসবের বৈজ্ঞানিক, অত্যাধুনিক ব্যাখ্যা এসব নিয়ে। তাকেও আমরা বাচতে দিলাম না।
একটি ছোট্ট এভিয়েসন কোম্পানীতে চাকরি করতো ওয়াশিকুর বাবু; সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা। রাতে আসার সময় খুঁজে খুঁজে বই নিয়ে আসতো। পরদিন সকালে কাজে যেতে হবে জেনেও রাতজেগে পড়তো। এই ব্যস্ততম জীবনের মাঝেও দারুন পড়াশুনার, লেখালেখির শখ ছিলো। এই ছোট্ট চাকরির যুবকরা খুব হতাশ হয়; জীবন থেকে ছিটকে পরে; স্বপ্নদেখা একদম ভুলে যায়। কিন্তু বিশাল স্বপ্ন ছিলো ওয়াশিকুরের। লেখালেখি করতো- ধর্মান্ধতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে; যুদ্ধপরাধীদের প্রতিরোধে। তাকেও আমরা বাচতে দিলাম না।
সিলেটের অনন্ত বিজয়। ব্যাংকের চাকরিকে বলা হয় তাবত দুনিয়ার সবচে ব্যস্ত চাকরি। এই চাকরিতে থেকেও তুমুল পড়াশুনা করেছেন- সৃষ্টির মানচিত্র, মানুষের উদ্ভব ও বিবর্তন বিষয়ে পরীক্ষণযোগ্য পাশ্চাত্যের তত্ত্ব নিয়ে। দিনভর ব্যাংকের ডেভিট ক্রেডিট আর রাতভর জাভামানব থেকে আধুনিক মানুব,লামার্কবাদ থেকে ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন; সোভিয়েত ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও বিপ্লব এসব জটিল গুরুত্বপূর্ণ বিসয়ে। যে কাজগুলো ছিলো প্রাণীবিজ্ঞানের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের, সেই কাজগুলো করতেন ব্যাংকার অনন্ত বিজয় দাশ। নিজের টিউশনির টাকা জমিয়ে বের করে ফেলেছেন- বিজ্ঞানচর্চার মাগাজিন 'যুক্তি'। সেই যুবকটিকেও আমরা বাচতে দিলাম না।
নিলয় নীল; চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়; ইংরেজিতে খুব ভালো ছিলো ছেলেটি; আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিদেশী পত্রিকা। তাই তার চোখে খুব সহজেই পড়ত- আইএস এর ৬ বছর থেকে ৭৮ বছর বৃদ্ধদের নিলামে তোলা; বোকা হারেম কিভাবে আফ্রিকার আদিবাসী, অধিবাসীদের নিশ্চিন্ন করছে; পাক-আফগানে তালেবান কিভাবে সংখ্যালঘুদের মাত্র ১% এর নিচে নিয়ে এসেছে। নিলয় এইএস, বোকা হারেম, আল কায়েদা, তালেবান ভাইদের এসব নিউজ অনুবাদ করে ফেসবুকে শেয়ার করতেন। আর এসব কি করে সইবে আইএস, তালেবান, বোকা হারেমদের এইদেশীয় দোসর ভাইয়েরা। তাকেও হারালাম।
বাংলাদেশ, তুমি কিভাবে তোমার চিন্তাশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, সৃষ্টিশীল যুবকদের লাশ ঢেকে আধুনিক হওয়ার অভিনয় করো; স্বাধীনতার বুলি কপচাও; উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখো!"
ছাত্রনেতা পাপলু বাঙ্গালী তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন- "পুলিশের কয়েক স্তর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে অভিজিৎ রায় খুন হোন। নীলয় নীল জীবন সংকটে জেনে যখন সাধারণ ডায়রী করতে যান। তখন পুলিশ জিডি লিপিবদ্ধ না করে বিদেশ চলে যেতে বলে। ওয়াশিকুর বাবুর খুনি হাতেনাতে ধরার পরও ঠিক কারা জড়িত এবং মূল খুনি তাদের ধরতে পারে না। অনন্ত বিজয় দাস হত্যার তিনমাস অতিবাহিত হতে যাচ্ছে কিন্তু ফলাফল শূণ্য। রাষ্ট্র কর্তৃক সকল এন্তেজাম তৈরি থাকলে হত্যাটা ধারাবাহিকভাবে ঘটবে। এটাই স্বাভাবিক।"
ঝর্ণা চৌধুরী তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন- "বিবেকের অবক্ষয়ে আজ মনুষ্যত্ব বিলীন!! চারিদিকে নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা আর হিংস্রতায় মানুষের রক্তে হোলিখেলা!! শিক্ষা দিন দিন কুশিক্ষার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত!! জ্ঞানের প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে মানুষ বুঝেও অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিজেদের তলিয়ে দিচ্ছে কিসের মোহে?"
ভেদাভেদ, বৈষ্যমতা,আধিপত্য বিস্তার,আগ্রাসী মনোভাব, লোভ-লালসা,হিংসা-বিদ্বেষ,হানাহানি-মারামারিকে প্রশ্রয় দিয়ে মানুষ নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে এই বোধদয় হবে আর কবে?হায় মানবতা, তোমার ছায়াতলে একটু আশ্রয় দাও মানুষ নামধারী প্রাণিকে"!
শামস রাশীদ জয় তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন- "স্মৃতি, মাঝে মাঝে তুমি বড়ই নিষ্ঠুর। নিলয় নীল যেখানেই থাকুক, যেন ভালো থাকে, চির শান্তিতে থাকে।
নীলমণি সুলতা নীলন্তী তার স্ট্যাটাসে লিখেন- "সংবিধানে কি দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা লেখা নাই? নাকি খালি মন্ত্রী মিনিস্টারদেরই গেবন আছে,যেটা মহামূল্যবান? জঙ্গীদের সাথে কি তবে সরকারের এমন কোনো গোপন চুক্তি হইছে যেটায় প্রত্যেক মাসে ব্লগার,লেখক হত্যার বৈধতা দিবে?"
মাহমুদুল হক মুন্সী বাঁধন তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, "অনন্ত বিজয়দা কে কোপানোর পর কে জানি বলতেছিলো এর পর ঘরে ঢুকে কোপাবে আমাদের। তাই হয়ে গেলো। নীলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘরে ঢুকে। খবরটা জানলাম বিবিসি ভারত থেকে ফোন করে আমার বক্তব্য জানতে চাওয়ার পর। আমার কোন বক্তব্য নেই।
তিন-চার পুরুষ আগেও যারা হিন্দু ছিলো, তারা তাদের মোসলমানিত্ব ফলাচ্ছে চাপাতির কোপে। আর আমরা হয়েছি ভেড়ার পাল। একের পর এক খুন হয়ে গিয়ে নিজেদের রক্তে ভিজিয়ে বাংলাদেশকে পাক পবিত্র করে তুলছি প্রতিবার।"
উল্লেখ্য,নিহত নিলয় নীল মুক্তমনা, নবযুগ ও ইস্টিশন ব্লগে লেখালেখির পাশাপাশি ফেসবুকেও সক্রিয় ছিলেন এবং তিনি যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সরব ছিলেন।