নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৭ আগস্ট, ২০১৫
সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে গ্রেফতারের ঘটনায় সামাজিক যোগােযাগ মাধ্যমে ক্ষোভের ঝড় বইেছ। শহীদ পরিবারের সন্তান, যুদ্ধাপরাধী নিয়ে লিখে পঙ্গুত্ব বরণ করা এই সংবাদিককে গ্রেফতারের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ধনকুবের মুসা বিন শমসেরকে দায়ী করেছেন অনেকে।
রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে অবস্থিত “উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ” কার্যালয় থেকে তাকে নিয়ে যাবার পর, তাকে নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে রাজপথের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়াজ তুলেন দেশের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।
ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট অমি রহমান পিয়াল সোমবার ফেসবুকে লিখেছেন “মুক্তিযুদ্ধে এতগুলো স্বজন হারিয়েছেন, স্বাধীন দেশে চলাচলের পা হারিয়েছেন। নীতি এবং বিবেক হারাননি প্রবীর সিকদার। হারাননি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার অদম্য মনোবল। হারাননি লড়ে যাওয়ার স্পৃহা। এমন যোদ্ধাকে হারাতে হলে মিত্রের বেশেই তো পিঠে ছুরি মারতে হবে...”
প্রবাসী সাংবাদিক ফললুর বারী ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন, “রাজাকার মুসা বিন শমশেরের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন ফরিদপুরের সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সন্তান প্রবীর সিকদার। এই রাজাকারের শুধু টাকার প্রতাপ না, ক্ষমতারও প্রতাপ! কারণ সে শেখ সেলিমের বেয়াই। রাজাকার মুসা তখন গুণ্ডা লেলিয়ে দিয়ে প্রবীর সিকদারকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। দ্রুত তাকে ঢাকা আনতে পারায় বাঁচানো গিয়েছিল। কিন্তু তার একটা পা কেটে ফেলতে হয়। তখন সারাক্ষণ তার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। শেখ হাসিনা তখনো ক্ষমতায়। তিনি প্রবীরকে সিঙ্গাপুর পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন।” এরপর বারী লিখেছেন, “কিন্তু শেখ সেলিমের বেয়াইকে গ্রেপ্তার করাননি! শেখ হাসিনা এখনো ক্ষমতায়। রাজাকার মুসার ক্ষমতা এখনো বেয়াই শেখ সেলিম! তাই প্রবীর আবার রাজাকার মুসার বিরুদ্ধে লিখেছেন তাই ডিবিতো ধরে নেবেই। নিরাপত্তার কথা বলে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার ফোন সব কেড়ে নেয়া হয়েছে! শেখ হাসিনা কিছু করতে পারবেন? মনে হয় না। কারণ বাঁশের চেয়ে বড় কঞ্চির মতো রাজাকারের বেয়াই শেখ সেলিম যে প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে।” মামলা হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ফললুর বারী লিখেছেন, “স্বপন পাল নামের একজনকে দিয়ে মামলা করানো হয়েছে! এর পিছনে প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন! প্রধানমন্ত্রীর দেয়া টাকায় সিঙ্গাপুর থেকে নকল পা লাগিয়ে এসেছিলেন প্রবীর! সেই এক পা ওয়ালা প্রবীরকে ধরে নিয়ে গেল প্রধানমন্ত্রীর পুলিশ! কোথায় যাচ্ছে আমার বাংলাদেশ?”
সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান লিখেছেন "আচ্ছা, মাত্র ৪ মাস আগে ১৮ এপ্রিল ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের এক পথসভায় গুলিতে থানার ওসিসহ যে ৬ জন আহত হয়েছিলেন; ওই ঘটনায় কি কোনো মামলা হয়েছিলো? কেউ কি গ্রেপ্তার হয়েছিলো? কোনো তদন্ত কি হয়েছিলো? কাউকে কি আদালতে হাজির করা হয়েছিলো? কাউকে কি কারাগারে পাঠানো হয়েছিলো? হায়! পুলিশের ওসি কাঁধে গুলি খেলেও তাকে বড়জোর তেঁতুলের গুলি মনে করে পুলিশকে হজম করতে হয়।"
সাংবাদিক পুলক ঘটক লিখেছেন " জেগে ওঠো জনতা, শাহবাগই ঠিকানা। প্রবীর সিকদার জেলে থাকবে না কি যুদ্ধাপরাধী জেলে থাকবে তার চুড়ান্ত ফয়সালা হওয়া প্রয়োজন। মন্ত্রীর শক্তি বেশী নাকি জনতার শক্তি বেশী - সেটারও চড়ান্ত ফয়সালা হওয়া প্রয়োজন।" গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার লিখেছেন: শহীদ সন্তান সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে ছেড়ে দিন। জনকন্ঠ, একাত্তর টিভি এরপর প্রবীর সিকদার? হিসাবটা খুব কিন্তু জটিল না! ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট মাহমুদুল হক মুন্সী লিখেছেন: "জনকন্ঠে প্রচারিত "সেই রাজাকার" সিরিজটির কথা মনে আছে? বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবার পর ক্ষমতায় আসা অবৈধ সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানের সরকার ছেড়ে দেয় বিচারাধীন প্রায় এগার হাজার রাজাকার-আলবদর-আলসামসকে। মিশে যায় সমাজে, মিশে যায় স্বাধীন বাংলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বিষবৃক্ষ পুঁতে দেয়া হয় বাংলার বুকে। ২০০১ এ যখন সেই সামরিক জান্তার তৈরী করা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়, সেই বৈরী পরিবেশে লুকিয়ে থাকা, ছড়িয়ে থাকা সেই সব রাজাকারদের সামনে এনে দেন কিছু অমিত সাহসী সাংবাদিক। ফরিদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ রাজাকার "নুলা মুসা" বা "মুসা বিন শমশের"র কথা জানলেও সারাদেশ এই রাজাকারের কথা জানে সেই প্রথমবার। যে মানুষটি নিজের জীবন বাজি রেখে এই নুলা মুসার মুখোস খুলে দেন, তাঁর নাম সাংবাদিক প্রবীর শিকদার। খবরটি প্রকাশিত হবার পর বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয় এই অমিত সাহসী সাংবাদিকের একটি পা। পায়ের যন্ত্রণায় কাঁদেন, "ঘোস্ট পেইন" এ প্রায়ই ভুগেন এই মানুষটি। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ও পাক সেনারা হত্যা করেছিল তাঁর পরিবারের ১৪ জনকে। কদিন ধরে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানাচ্ছিলেন, তিনি উদবিগ্ন। নুলা মুসা আবার তাঁর জীবন হরনের জন্য ঘুরছে। আজ তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ডিবি অফিসে। ডিবির একটি গাড়ি এসে তাঁকে তুলে নিয়ে গেছে। জানতে চাওয়া হলে বলা হয়েছে তাঁর ফেসবুকে নিরাপত্তাহীনতার স্ট্যাটাসের জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। পুলিশ প্রবীর সিকদারকে ছেড়ে দেবে না বলে তার ছেলে সুপ্রিয় শিকদারকে জানিয়ে দিয়েছে। তাঁর ছেলে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবার একটি পা নেই, রাতে যেন একটু শোবার ব্যবস্থা করা হয়, তিনি একটানা বসে থাকতে পারেন না। সারারাত তাঁকে চেয়ারে বসে থাকতে হবে, পুলিশ তাঁকে জানিয়ে দিয়েছে। আসুন, আমরা শুকরিয়া আদায় করি রাজাকার নুলা মুসা নরম বিছানায় ঘুমাচ্ছে। আসুন আমরা শুকরিয়া আদায় করি, মৃত্যু ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত-পঙ্গু একজন সাংবাদিক সারা রাত একটি ডিবি অফিসের চেয়ারে বসে থাকবেন শুধু তাঁর প্রাণটি বাঁচাতে চেয়েছিলেন বলে। আমার খুব কষ্ট লাগে। দুঃখ লাগে এই কথা ভেবে, এই দেশে একটি গণজাগরণ হয়েছিলো, সেই জাগরণে আমরা কিছু প্রতিজ্ঞা করেছিলাম... আসলে সব প্রতিজ্ঞাই ভাঙ্গার জন্য।"
সাংবাদিক শরিফা বুলবুল লিখেছেন" আমার দাদাভাই সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে তথ্য প্রযুক্তি আইনে করা মামলায় হয়রানী করা হচ্ছে।আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।নিঃশর্তে তাঁকে মুক্তি দেয়া হোক। এ কথা কে না জানে, ২০০১ সালে দৈনিক জনকন্ঠের ফরিদপুর প্রতিনিধি থাকাকালে সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের এই সন্তান।সে সময় তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়।সেই থেকে অামার দাদাভাই অনেক কষ্টে একপায়ে ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটেন এই বাঙলার সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।তবু কোনো অন্যায় কিম্বা অসতার কাছে মাথা নত করেননি। কেন তবে আমার নিরীহ দাদাভাইকে এভাবে অপমান করা হচ্ছে?কারা এর পেছনে দায়ি?কি তাদের উদ্দেশ্য?"