Sylhet Today 24 PRINT

আলতাফ মাহমুদের ৪৪তম অন্তর্ধান দিবস আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ৩০ আগস্ট, ২০১৫

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় আলতাফ মাহমুদকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট। পরে আর ফেরেননি এ সংগীতজ্ঞ।

আজ একুশের গানের অমর সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদের অন্তর্ধান দিবস। গান, কবিতা, স্মৃতিকথা ও পদক প্রদানের মাধ্যমে স্মরণ করা হবে দিনটিকে।

শহীদ আলতাফ মাহমুদ, অনেকের কাছেই ঝিলু নামে পরিচিত। একাধারে ছিলেন কবি, সুরকার এবং গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক, নৃত্য পরিচালক, প্রযোজক। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে গানটি গাওয়া হয়, সেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…‘ গানের সুরকার আলতাফ মাহমুদ।

১৯৩৩ সালের ২৩শে ডিসেম্বর বরিশাল জেলার মুলাদি উপজেলার পাতারচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গুণী এই ব্যক্তি। ১৯৪৮ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে তিনি মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করে ভর্তি হন বিএম কলেজে। পরে তিনি চিত্রকলা শিখতে ক্যালকাটা আর্টস স্কুলে যান। প্রসিদ্ধ ভায়োলিন বাদক সুরেন রায়ের কাছে প্রথম সঙ্গীতে তালিম নিয়ে তিনি গণসংগীত গাইতে শুরু করেন এবং প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

১৯৫০ সালের দিকে তিনি ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য বিভিন্ন জায়গায় গণসংগীত গাইতেন। গান গাওয়ার মাধ্যমে মাহমুদ এই আন্দোলনকে সর্বদাই সমর্থন যুগিয়েছেন।

২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো শিরোনামের আলোড়ন সৃষ্টিকারী গানটিতে সুর সংযোজন করে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেন।

১৯৬৯ সালে তিনি আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটিতে পুনরায় সুরারোপ করেন, যেটি প্রথমত সুর করেছিলেন আব্দুল লতিফ। এই সুরটি জহির রায়হানের চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া’য় ব্যবহৃত হয়।

১৯৭১ সালে আলতাফ মাহমুদ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ক্র্যাক প্লাটুনের একজন সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তাঁর ঢাকার রাজারবাগের আউটার সার্কুলার রোডের নিজ বাসায় গোপন ক্যাম্প স্থাপন করেন। কিন্তু ক্যাম্পের কথা ফাঁস হয়ে গেলে ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট বাসা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কিছু এ দেশীয় দোসরদের সহায়তায় চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায় তাঁকে। পরবর্তীতে আর খোঁজ মিলেনি তাঁর। আজও সবার অজানা কী নির্মমতা ঘটেছিল তাঁর ভাগ্যে।

আলতাফ মাহমুদকে হত্যার অভিযোগে যুদ্ধাপরাধী ও আল বদর নেতা আলী আহসান মুহাজিদের শাস্তি ঘোষিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে। ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের রায়ে মুজাহিদকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আলবদর নেতা ও যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদের বিপক্ষে এ সংক্রান্ত অভিযোগে বলা হয়- মুক্তি যুদ্ধ চলাকালে সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহিরউদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে আটক করে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরোনো এমপি হোস্টেলে রাখা হয়।

৩০ অগাস্ট রাত ৮টার দিকে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামি ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি মুজাহিদ ও সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী সেখানে গিয়ে এক সেনা কর্মকর্তাকে পরামর্শ দেন, রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। এ সিদ্ধান্তের পর সহযোগীদের নিয়ে মুজাহিদ আর্মি ক্যাম্পে আটকদের অমানসিক নির্যাতনের পর জালাল ছাড়া বাকিদের হত্যা করেন।

১৯৭৭ সালে বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখার জন্য আলতাফ মাহমুদকে একুশে পদক প্রদান করা হয় এবং সংস্কৃতিক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় শহীদ আলতাফ মাহমুদকে ২০০৪ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।

আলতাফ মাহমুদ পদক
আলতাফ মাহমুদকে স্মরণ রাখতে তাঁর পরিবার ও ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলাদের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় শহীদ আলতাফ মাহমুদ ফাউণ্ডেশনের। এ ফাউণ্ডেশন ২০০৫ সাল থেকে গুণীজনদের আলতাফ মাহমুদ পদক দিয়ে আসছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধারাবাহিকতা হিসেবে এবার দুই গুণীজনকে সম্মাননা দেবে ফাউণ্ডেশনটি। এবার পদক পেয়েছেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ও সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী।

আলতাফ মাহমুদের অন্তর্ধান দিবসে রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে সম্মাননা ও পদক দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন সালাউদ্দিন জাকী।

পদক প্রদান প্রসঙ্গে শহীদ আলতাফ মাহমুদের কন্যা এবং ফাউণ্ডেশনের সদস্য সচিব শাওন মাহমুদ জানান- সাহিত্য ও সঙ্গীতে অবদান রাখার জন্যে এবার আমরা দুই গুণী ব্যক্তিত্বকে বেছে নিয়েছি। এটা একটা ধারাবাহিকতা।

শাওন মাহমুদ আরও বলেন- শহীদ আলতাফ মাহমুদ ফাউণ্ডেশন সম্পুর্ণ পারিবারিক এবং ক্রাক প্লাটুনের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠন ও পরিচালিত হয়ে আসছে। এবং ২০০৫ সাল থেকে এ ফাউণ্ডেশন গুণীজনদের পদক দিয়ে আসছে।

ফাউন্ডেশন এর সকল সদস্যদের মতামত অনুযায়ী পদকপ্রাপ্ত প্রত্যেক গুণীজনকে একটি ক্রেস্ট, উত্তরীও এবং ১০,০০০ হাজার টাকা প্রদান করা হবে- জানান শাওন মাহমুদ।

উল্লেখ্য, ৩০ আগস্ট ২০০৫ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বিশিষ্ট চিত্রগ্রাহক বেবি ইসলাম কে সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে শহীদ আলতাফ মাহমুদ ফাউন্ডেশন এর যাত্রা শুরু হয় ।

এরপর ৩০ আগস্ট ২০০৬ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ডঃ এনামুল হক, ৩০ আগস্ট ২০০৭ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বাংলাদেশের অন্যতম সঙ্গীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন, ৩০ আগস্ট ২০০৮ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সঙ্গীতশিল্পী অজিত রায় এবং সঙ্গীত পরিচালক খোন্দকার নুরুল আলম, ৩০ আগস্ট ২০০৯ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সঙ্গীতশিল্পী এবং বিশেষজ্ঞ সুধীন দাস, ৩০ আগস্ট ২০১০ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক বিপুল ভট্টাচার্য, ২৩ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে শিল্পকলা একাডেমীতে উদীচী আয়োজিত শহীদ আলতাফ মাহমুদ এর জন্মদিন উদযাপন অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশন সঙ্গীত পরিচালক আলম খান, ৩০ আগস্ট ২০১২ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং নায়ক রাজ রাজ্জাক, ৩০ আগস্ট ২০১৩ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার এবং সঙ্গীত পরিচালক মোঃ শাহ্‌নেওয়াজ এবং ৩০ আগস্ট ২০১৪ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এবং সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল-এর হাতে শহীদ আলতাফ মাহমুদ পদক তুলে দেওয়া হয়।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.