Sylhet Today 24 PRINT

ইত্যাদিতে প্রচারের পর প্রশংসায় ভাসছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেই চিকিৎসক দম্পতি

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০২ ডিসেম্বর, ২০১৯

টাঙ্গাইলের মধুপুরের কালিয়াকুড়ি গ্রামে ১৯৮৩ সালে নিউজিল্যান্ড থেকে এসে গরীব মানুষদের জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন ডা. এড্রিক বেকার। নামমাত্র মূল্যে রোগীদের সেবা দিয়ে পরিচিতি পান ‘ডাক্তার ভাই’ হিসেবে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ২০১৫ সালে মারা যান এই চিকিৎসক।

ডা. এড্রিক বেকারের আহ্বানে তার এই ‘কালিয়াকুড়ি হাসপাতাল’ এর হাল ধরতে ছুটে আসেন আমেরিকার চিকিৎসক দম্পতি ডা. জেসান ও ডা. মারিন্ডি।

২০১৮ সালে সন্তানদের নিয়ে আমেরিকা থেকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে চলে আসেন ডা. জেসান ও ডা. মারিন্ডি। দায়িত্ব নেন মধুপুরের এই হাসপাতালের। তারা পরিচিতি পান ‘নতুন ডাক্তার ভাই’ ও ‘দিদি’ হিসেবে।

গত শুক্রবার বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে এই চিকিৎসক দম্পতি ও হাসপাতাল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় প্রতিবেদনটি। তাদের নিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদনটি শেয়ার দিয়ে প্রশংসা করেন অনেকে।

মধুপুরের এই হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৪১ সালে এড্রিক বেকার নিউজিল্যান্ডের একটি ক্যাথলিক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন পরিসংখ্যানবিদ। মা শিক্ষক। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এড্রিক ডুনিডেন শহরের ওটাগো মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ওয়েলিংটনে ইন্টার্নি শেষে নিউজিল্যান্ড সরকারের সার্জিক্যাল টিমে যোগ দিয়ে চলে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে। সেখানে কাজ করেন ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। তিনি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন কোর্স করেন ট্রপিক্যাল মেডিসিন, গাইনি ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে। ১৯৭৬ সালে পাপুয়া নিউগিনি ও জাম্বিয়ায় যান। কিন্তু কোথাও মন টেকে না। এরই মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চলে যান যুক্তরাজ্যে। এক বছর পর সুস্থ হয়ে ১৯৭৯ সালে চলে আসেন বাংলাদেশে। হুট করে বেকার বাংলাদেশে চলে এসেছেন এমন নয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা, ভারতগামী শরণার্থীদের ছবি নিয়মিত ছাপা হতো। এসব ছবি দেখে নিউজিল্যান্ডের তরুণ চিকিৎসক বেকারের মন কাঁদত বাংলাদেশের মানুষের জন্য। এড্রিক বেকার মনেমনে সংকল্প করেন একদিন এ দেশে আসবেন। ১৯৭৯ সালে তিনি এলেন বাংলাদেশে। সেই যে এলেন আর ফেরা হলো না।

সেখান থেকেই টাঙ্গাইলের মধুপুরগড় এলাকায় অবস্থান করে এ দেশের হতদরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন বেকার। সেই থেকে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিতে শুরু করেন ডা. এড্রিক বেকার।

১৯৮৩ সালে দু'জন খণ্ডকালীন এবং তিনজন সার্বক্ষণিক কর্মী নিয়ে বেকারের নতুন যাত্রা শুরু হয়। দিনদিন বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। তখন থানার বাইরের পাশের গ্রাম কাইলাকুড়িতে ১৯৯৬ সালে উপকেন্দ্র খুলে চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করেন। ২০০২ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে ৯৩ জন গ্রামীণ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ শুরু করেন। এলাকার আদিবাসী-বাঙালি প্রায় সবাই হতদরিদ্র।

এ রকম একটি প্রত্যন্ত এলাকায় চার একর জায়গার ওপর ডা. এড্রিক বেকারের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছোট-ছোট মাটির ২৩টি ঘরে হাসপাতালের ডায়াবেটিস বিভাগ, যক্ষা বিভাগ, মা ও শিশু বিভাগসহ আলাদা অনেক বিভাগ চালু করেন। এখানে ভর্তির সময় রোগীর জন্য ২০০ টাকা এবং রোগীর সঙ্গে আসা স্বজনের জন্য ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যেই রোগীর থাকা-খাওয়াসহ যতোদিন সময় লাগে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ডা. এড্রিক বেকার তার নিজ দেশে নিউজিল্যান্ড থেকে আর্থিক সাহায্য এনে এখানকার দরিদ্র লোকদের সেবা প্রদান করতেন।

ডা. এড্রিক বেকার দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ২০১৫ সালে মারা যান। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিতে চাইলে তিনি যান নি। তিনি মৃত্যুর আগে চেয়েছিলেন বাংলাদেশি কোনো ডাক্তার যেন গ্রামে এসে তার প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালের হাল ধরেন। কিন্তু এ দেশের একজন ডাক্তারও তার সেই আহ্বানে সাড়া দেননি। তবে দেশের কেউ সাড়া না দিলেও এড্রিক বেকারের আহ্বানে সাড়া দেন আমেরিকার দম্পতি ডাক্তার জেসান ও মারিন্ডি।

ডা. জেসান বলেন, এড্রিক বেকার বেঁচে থাকার সময় কালিয়াকুড়ির এই হাসপাতালটি পরিদর্শনে এসেছিলাম। পরবর্তীতে ডাক্তার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনি। কিন্তু তখন নিজের প্রশিক্ষণ ও ছেলেমেয়েরা ছোট থাকার কারণে আসতে পারিনি। অবশেষে সবকিছু গুছিয়ে সম্পদ আর সুখের মোহ ত্যাগ করে ২০১৮ সালে পুরো পরিবার নিয়ে আমেরিকা ছেড়ে স্থায়ীভাবে চলে আসি টাঙ্গাইলের মধুপুরে।

জেসান আরো বলেন, ‘গ্রামের স্কুলে আমাদের সন্তানদের ভর্তি করে দিয়েছি। তারা গ্রামের শিশুদের সঙ্গে পড়ালেখা ও খেলাধুলা করে।’

স্থানীয়রা জানান, নতুন ডাক্তার ভাই জেসান অবসরে লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়ান। তিনি একটি মাটির ঘরে বসবাস করেন এবং সবার সাথেই খোলামেলাভাবে কথা বলেন। এ দেশের ফল তাদের খুব প্রিয়। আমাদের ডাক্তার ভাই ও দিদি বাংলায় কথা বলতে পারেন। তাদের সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখাচ্ছেন। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.